ফাইয়াজ কৌশিক ও অনুরাশা রাফানাঃ-
কাঠ এবং কর্কশিট দিয়ে কেউ তৈরি করেছেন হাসপাতাল, কেউ স্টেডিয়াম, কেউবা বহুতল ভবন; কিন্তু সবকিছু স্থান পেয়েছে একই ছাদের নিচে। চারিদিকে উৎসবের আমেজ। কেউ ব্যস্ত অনুষ্ঠান আয়োজনে, কেউ ব্যস্ত হাসি-আড্ডায়, আবার কারও তাড়াহুড়া প্রবন্ধ উপস্থাপনের প্রস্তুতিতে। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগে গিয়ে দেখা যায় এ দৃশ্য।
নগরজীবনের কোলাহল, অবকাঠামোর দ্রুত রূপান্তর, আর পরিবেশের প্রতি মানুষের ক্রমবর্ধমান দায়বদ্ধতা থেকেই চুয়েটে আয়োজিত হলো পরিবেশবান্ধব স্থাপত্য বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন। দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনের আয়োজন করেছে চুয়েট ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) স্থাপত্য বিভাগ।
এদিন সকাল ১০টায় এক রঙিন র্যালির মাধ্যমে সম্মেলনের সূচনা হয় চুয়েট ক্যাম্পাসে। র্যালির পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন চুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাহমুদ আব্দুল মতিন ভুইয়া। তাঁর কথায় ফুটে ওঠে নতুন প্রজন্মের সৃজনশীলতা ও গবেষণা দিয়ে পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যৎ রচনা করার প্রতি প্রত্যাশা।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান মোঃ খালেকুজ্জামান চৌধুরী, স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডীন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান, বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. এস. এম. নাজমুল ইমামসহ দেশ-বিদেশের অন্যান্য শিক্ষাবিদ।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর শুরু হয় মূল বক্তব্য। বক্তৃতা দেন মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মাসা নোগুচি এবং আরবানা বাংলাদেশ এর প্রধান স্থপতি কাশেফ মাহবুব চৌধুরী।
অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ড, ভারত, কানাডা এবং বাংলাদেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণে সম্মেলনের আঙ্গিনা পরিণত হয়েছিল এক ক্ষুদে গবেষণা বিশ্বমেলায়। দুইদিনব্যাপী এ সম্মেলনে অনুষ্ঠিত হয় মোট ১৬টি টেকনিক্যাল সেশন। পাশাপাশি ছিল পোস্টার প্রদর্শনী, একটি যৌথ আন্তর্জাতিক পিএইচডি গবেষণা সেমিনার এবং এনভায়রনমেন্ট আর্কিটেকচার বিষয়ে ৫টি প্যারালেল কর্মশালা, যেখানে নতুন ধারণা, নতুন ব্যাখ্যা আর ভবিষ্যতের নকশা নিয়ে কর্মশালাগুলো হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। বিভিন্ন দেশ থেকে উপস্থাপিত হয় ৬টি পিএইচডি গবেষণা। সম্মেলনে জমা পড়ে মোট ১৫০টি গবেষণাপত্র; এর মধ্যে দুই দিনে ১৬টি সেশনে উপস্থাপিত হয় ৮০টিরও বেশি পেপার এবং প্রদর্শিত হয় ৪০টির অধিক পোস্টার। তরুণ গবেষকদের সেসব উপস্থাপনায় ফুটে ওঠে আগামীর বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের নানা দৃষ্টিভঙ্গি।
সম্মেলনস্থলে স্থাপত্যশৈলী প্রদর্শনী আলাদা এক উচ্ছ্বাস যোগ করে। শিক্ষার্থীদের নকশায় ফুটে ওঠে প্রাকৃতিক শহুরে সৌন্দর্য, একই সঙ্গে আধুনিক নগর পরিকল্পনার দৃষ্টিভঙ্গিও। দিনশেষে আয়োজিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, গবেষণার গাম্ভীর্যকে ছুঁয়ে যায় শিল্পের কোমল ছোঁয়া।
সম্মেলনের সেক্রেটারি ও চুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. সজল চৌধুরী বলেন- “এ ধরনের সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য মূলত শিক্ষার্থীদের গবেষণায় উৎসাহী করা এবং উপস্থাপিত গবেষণা যাতে ভবিষ্যতে দেশ ও বিশ্বের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে অবকাঠামোগত কাজে অদক্ষতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশ দূষণ হয়। আমরা পরিবেশবান্ধব ভাবে করার জন্য আগ্রহী করতে এ সম্মেলনের আয়োজন করেছি। সম্মেলনে দেশ-বিদেশের বিখ্যাত গবেষক, বিজ্ঞানী, শিক্ষক ও নীতিনির্ধারকেরা অংশ নিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে তাঁদের সঙ্গে আমাদের শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ এবং জ্ঞান আদান-প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।”
সম্মেলনে পৃষ্ঠপোষকতায় ছিল নিপ্পন পেইন্ট, বিএসআরএম, সেভেন রিংস সিমেন্টসহ দেশের বিভিন্ন নামকরা শিল্পপ্রতিষ্ঠানসমূহ।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ যখন দিন দিন তীব্র হচ্ছে, তখন চুয়েটে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলন শুধু একটি আয়োজন নয়,এ এক প্রতিশ্রুতি। প্রকৃতি, প্রযুক্তি আর মানবিকতার সমন্বয়ে গড়ে তোলা ভবিষ্যতের প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর যেন স্থাপিত হলো এখানেই।