ভর্তি পরীক্ষা নয়, এ যেন চুয়েট ক্যাম্পাসেরই এক উৎসব

জারীন তাসমীন সাবাঃ-

ভোর পেরোতেই চুয়েট ক্যাম্পাসে পা রাখলে মনে হয়, আজ যেন কোনো সাধারণ পরীক্ষা নয়—কোনো উৎসব চলছে এখানে। চারপাশে রঙিন আলপনা, হাসিমুখ স্বেচ্ছাসেবক, কোলাহল আর কৌতূহলে ভরা অভিভাবক–পরীক্ষার্থীদের ভিড়। একটু থেমে তাকালেই বোঝা যায়, ভর্তি পরীক্ষা এখানে শুধু একটি একাডেমিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; রীতিমতো একটি মিলনমেলা।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে আজ ১৭ জানুয়ারি (শনিবার)। পরীক্ষাকে ঘিরে ক্যাম্পাসজুড়ে যে সুবিন্যস্ত আয়োজন ও আন্তরিক আতিথেয়তা চোখে পড়েছে, তাতে মুগ্ধ হন ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আগত অভিভাবকরাও। আগত পরীক্ষার্থী থেকে শুরু করে ক্যাম্পাসের প্রতিটি মানুষের মুখেই যেন একই কথা— “ভর্তি পরীক্ষা যেন চুয়েটে একটি উৎসব!”

পরীক্ষার আগের রাতেই পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে আঁকা হয় বর্ণিল আলপনা। বিভিন্ন ক্লাব ও আঞ্চলিক সংগঠনের উদ্যোগে স্থাপন করা হয় আকর্ষণীয় স্টল। এসব স্টলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য ছিল দিকনির্দেশনা, তথ্যভিত্তিক সহায়তা ও সার্বিক সহযোগিতা। পাশাপাশি ক্লাবগুলোর কার্যক্রম তুলে ধরে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও দক্ষতার পরিচয়ও দেওয়া হয়।

বিভিন্ন হলের পক্ষ থেকে আগত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য ছিল খাবার ও পানির ব্যবস্থা। ক্যাম্পাসের ক্যান্টিনগুলোতেও রাখা হয় পর্যাপ্ত খাবারের সুব্যবস্থা। স্টলগুলো ঘুরে দেখা যায়, শুধু তথ্য নয়—উৎসাহ জোগাতে ছিল নানান প্রতিযোগিতার আয়োজনও।

চুয়েটের রোবটিক্স গবেষণা সংস্থা রোবো মেকাট্রনিক্স অ্যাসোসিয়েশনের (আরএমএ) স্টলে ছিল বিশেষ আকর্ষণ। সেখানে রোবট দিয়ে ফুটবল খেলার আয়োজন করা হয় অভিভাবকদের জন্য। গোল করলেই মিলছে চকলেট! পাশাপাশি ছিল ড্রোন প্রদর্শন, রোবো রেস ও বিভিন্ন প্রকল্প প্রদর্শনী, যা আগতদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করে।

চুয়েটের একমাত্র পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিন ফর পিস আয়োজন করে “একটি বোতলে একটি গাছ” স্লোগানে ৩০টি গাছ রোপণের কর্মসূচি। এই উদ্যোগ পরিবেশ সচেতনতার বার্তাকে পৌঁছে দেয় সবার কাছে।

টিএসসির সামনে চোখে পড়ে চুয়েট ফটোগ্রাফিক সোসাইটির আলোকচিত্র প্রদর্শনী। শিক্ষকবৃন্দ ও ছাত্রকল্যাণ অধিদপ্তরের উপস্থিতিতে উদ্বোধন করা হয় “Campus Through The Third Eye – Season 5”—নবীন শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজিত একটি ফ্রেশার্স ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতা।

ক্যাম্পাসজুড়ে গান-বাজনার সুরে তৈরি হয় প্রাণবন্ত আবহ। জয়ধ্বনি, রেডিও চুয়েটসহ বিভিন্ন সংগঠনের পরিবেশনায় আড্ডা আর সংগীত যেন সবাইকে মনে করিয়ে দেয়— “চুয়েট একটি পরিবার।”
ভাষা ও সাহিত্য সংসদের স্টল ছিল ভাষাপ্রেমীদের জন্য আলাদা আকর্ষণ, যেখানে নিজের মনের ভাব প্রকাশের সুযোগ পেয়েছেন অনেকে। চুয়েট চেস ক্লাব আয়োজন করে দাবা খেলার, আর বৃহত্তর ময়মনসিংহ অ্যাসোসিয়েশন অভিভাবকদের জন্য নিয়ে আসে মজার বালিশ খেলা প্রতিযোগিতা।

ভর্তি পরীক্ষা উপলক্ষে টিএসসি ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় নারী অভিভাবকদের জন্য রাখা হয় আলাদা বসার ব্যবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে অভিভাবকদের জন্য ছিল আরামদায়ক পরিবেশ। পুরো সময়জুড়ে চুয়েটের শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেন—আবাসন খোঁজা থেকে শুরু করে রোড গাইড ও সার্বিক দিকনির্দেশনায়।

মেয়েকে পরীক্ষা দিতে নিয়ে আসা অভিভাবক আজমল রহমান বলেন,
“আয়োজনের সুন্দর ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের আন্তরিকতা সত্যিই দারুণ। তাদের চেষ্টা আর মনোযোগ প্রতিটি জায়গায় চোখে পড়েছে। ক্যাম্পাসের পরিবেশ ও শিক্ষার মান আমাদের খুব মুগ্ধ করেছে।”

আরেক অভিভাবক রোকসান আরা খাতুন জানান,
“বিভিন্ন ক্লাবের স্টল ঘুরে দেখলেই বোঝা যায়, এখানে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বিকাশের জন্য কত রকম সুযোগ রয়েছে। এসব কার্যক্রম তাদের প্রতিভা প্রকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।”

চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোস্তফা খালিদ বিন শামস আরিয়ান বলেন, “আমাদের কাছে ভর্তি পরীক্ষা শুধু পরীক্ষা না, এটা আসলে ক্যাম্পাসের একটা উৎসব। এই সময়টাতে আমরা সবাই মিলে আনন্দ করি, নতুনদের স্বাগত জানাই। কে কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে হলে যাবে, কোথায় পরীক্ষা দেবে—এসব নিয়ে সহযোগিতা করতেই ভালো লাগে। সিনিয়র–জুনিয়র, ক্লাব–সংগঠন—সবাই একসাথে কাজ করি যেন পরীক্ষার্থীরা আর অভিভাবকরা চুয়েটকে আপন ভাবতে পারে।”

আগত অভিভাবকরা চুয়েট ক্যাম্পাসের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পরিচ্ছন্নতা, সুযোগ-সুবিধা ও শিক্ষার পরিবেশ দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন। এই ক্যাম্পসের আতিথিয়তায় যেন মুগ্ধ সবাই। ভর্তি পরীক্ষাকে ঘিরে এই উৎসবমুখর আয়োজন তাদের দের মনে চুয়েটের প্রতি আস্থা ও ইতিবাচক ধারণাকে যেন আরও দৃঢ় করে তুলেছে।