সুপার কন্ডাক্টিভিটি বা অতিপরিবাহিতা..

সুপার কন্ডাক্টিভিটি বা অতিপরিবাহিতা..

  • Post published:August 11, 2019

জিওন আহমেদ:

পরিবাহীর রোধ-সম্পর্কে আমরা ওহমের সূত্রের কল্যাণে সকলেই জানি । আমরা জানি,পরিবাহির ক্ষেত্রে তাপমাত্রা বাড়াতে থাকলে মুক্ত ইলেকট্রনের সংখ্যা বেড়ে ইলেকট্রনদের মধ্যে সংঘর্ষ বেড়ে যায় । ফলে রোধ বেড়ে পরিবহণ ক্ষমতা কমে যায় । কিন্তু তাপমাত্রা ক্রমাগত কমাতে থাকলে পরিবাহী বা মুক্ত ইলেকট্রন এবং আয়নদের সাথে ইলেকট্রনের মধ্যে সংঘর্ষ ক্রমাগত কমতে থাকে । ফলে রোধ কমে যায় এবং পরিবহণ ক্ষমতা ক্রমাগত বাড়তে থাকে । এভাবে পরিবাহির তাপমাত্রা ক্রমাগত কমাতে থাকলে এর রোধ বা প্রতিরোধক্ষমতা কমতে কমতে কোথায় গিয়ে পৌঁছবে ? বহুচর্চিত এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সূচনা হল নতুন অধ্যায়ের । অতিপরিবাহীতা বা সুপারকন্ডাক্টিভিটি ।

বিদ্যুতের সুইচ চাপলেই বিদ্যুতের তারে ছুটে চলে অসংখ্য ইলেক্ট্রন । যেখানে রয়েছে বিদ্যুৎশক্তির প্রয়োগ, সেখানেই চলে ধাবমান ইলেক্ট্রনদের খেলা । ধাতুর মধ্যে ইলেক্ট্রনের গতিবিধি কী প্রকার ? পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম চাঞ্চল্যকর কিছু আবিষ্কার ঘটেছে এই প্রশ্নকে ঘিরে । প্রথমে কথা বলা যাক সেরকমই এক আবিষ্কার নিয়ে, যার নাম সুপারকন্ডাক্টিভিটি বা অতিপরিবাহীতা ।

পরিবাহী আর অতিপরিবাহী:

ধাতু হল বিদ্যুতের পরিবাহী । কোন কোন ক্ষেত্রে তা শুধু পরিবাহী নয়, আশ্চর্যজনকভাবে তাকে অতিপরিবাহীও বলা যায় । সাধারণত ধাতব পদার্থের মধ্যে বিদ্যুতের প্রবাহ বজায় রাখতে গেলে ক্রমাগত শক্তির যোগান দিয়ে যেতে হয় । অর্থাৎ এর মধ্য দিয়ে ইলেকট্রনকে পাঠাতে তাকে ধাক্কা দিতে হয় । যার জন্য বিদ্যুৎবাহী তারের দুই প্রান্তে বিভব প্রয়োগ করতে হয় । এক্ষেত্রে পরিবাহির এক পাশ থেকে ইলেকট্রনকে ধাক্কা দিয়ে অন্য পাশ থেকে ইলেকট্রনকে আকর্ষণ করা হলে গতিপ্রাপ্ত ইলেক্ট্রনদের এই চলন থেকে বিদ্যুৎপ্রবাহের সৃষ্টি হয় । বিদ্যুতের এক নির্দিষ্ট পরিমাণ বজায় রাখতে হলে ইলেক্ট্রনদের বাইরে থেকে কতখানি শক্তি যোগান দিয়ে যেতে হবে, তা নির্ভর করে ধাতুর রোধের ওপর । স্বল্প রোধের ধাতু দিয়ে তার বানালে শক্তি কম লাগে, খরচও বাঁচে । প্রতিরোধক্ষমতার রোধের অস্তিত্বের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে যে ধাবমান ইলেক্ট্রনরা কঠিন পদার্থের ভেতর সারিবদ্ধ আয়নদের সাথে ক্রমাগত ধাক্কা খায় । যত কমই হোক না কেন, একটু না একটু রোধ সবসময়ই উপস্থিত থাকবে । কারণ পারিপার্শ্বিক অণু-পরমাণুর বা আয়নের সাথে, এমনকি নিজেদের মধ্যেও, ইলেক্ট্রনদের কিছু না কিছু সংঘর্ষ ছাড়া ইলেকট্রন এক জায়গা থেকে অন্য যায়গায় যেতে পারেনা । ধাতুর গঠনগত দিক থেকে এরকম ধারণা তৈরি হওয়া ন্যায়সঙ্গত । কিন্তু গবেষণাগারের কিছু পরীক্ষানিরীক্ষা প্রায়শই নতুন চমক সৃষ্টি করে। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। ১৯১১ সালে ঘটে গেল এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। নেদারল্যান্ডসের লাইডেন শহরে কামারলিং ওনেস গবেষণা করছিলেন বিশেষ কিছু ধাতুর বিদ্যুৎ সঞ্চালন ক্ষমতা নিয়ে । তিনি লক্ষ্য করলেন, খুব ঠাণ্ডা অবস্থায় কঠিন আকারের পারদের মধ্যে বিদ্যুৎপ্রবাহ চলে শূন্য রোধে । যেন পদার্থের ভেতর ইলেক্ট্রনের সাথে পার্শ্ববর্তী অণু, পরমাণু, আয়ন বা ইলেকট্রন যা কিছু আছে তাদের বিন্দুমাত্র কোন ঘর্ষণ বা ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়ার অস্তিত্ব নেই । কঠিন পারদ তখন পরিবাহী ছাড়িয়ে পরিণত হয়েছে বিদ্যুতের অতিপরিবাহীতে। ধাতুর এই নতুন দশার নাম দেওয়া হল সুপারকন্ডাক্টার । জন্ম হল সুপারকন্ডাক্টিভিটী নামক বিষয়ের । ধাতুর মধ্যে ইলেকট্রনদের এমন শুন্য বাঁধায় প্রবাহ কিভাবে সম্ভব ? প্রায় চার দশক পর এর একটি সুষ্ঠু ব্যাখ্যা পাওয়া যায় । সুপারকন্ডাক্টিভিটী ব্যাখ্যা করার জন্য ইলেক্ট্রনের ধর্ম নিয়ে যে ধারণা থাকা প্রয়োজন, সেগুলো এসেছে পরের যুগে, কোয়ান্টাম তত্ত্ব আবিষ্কার হওয়ার পরে।

ইলেক্ট্রনদের মধ্যে আকর্ষণ:

সুপারকন্ডাক্টিভিটীকে সফলভাবে ব্যাখ্যা করেন তিনজন বিজ্ঞানী – জন বার্ডিন, লিওন কুপার ও জন রবার্ট শ্রীফার। তাঁদের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে এই বিখ্যাত তত্ত্বকে ডাকা হয় বি. সি. এস. তত্ত্ব নামে। তত্ত্বটি পূর্ণরূপে প্রকাশিত হয় ১৯৫৭ সালে। এর আগে অনেক বিশিষ্ট বিজ্ঞানী মাথা ঘামিয়েছেন সুপারকন্ডাক্টিভিটীর জট ছাড়াতে। তাঁদের অবদানও এই আবিষ্কারের ইতিহাসে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

বি.সি.এস.তত্ত্ব অনুযায়ী দুটি ইলেক্ট্রনের মধ্যে আকর্ষণ বল সুপারকন্ডাক্টিভিটির উৎস:

বি. সি. এস. তত্ত্ব অনুযায়ী সুপারকন্ডাক্টিভিটির জন্ম হয় যখন ইলেক্ট্রনরা একে অপরকে আকর্ষণ করে। শুনে অনেকে হয়ত আশ্চর্য হচ্ছেন। আমরা চিরকাল জেনে এসেছি যে দুটো ইলেক্ট্রনের মধ্যে কুলম্বের সূত্র অনুযায়ী বিকর্ষণ বল কাজ করে। আকর্ষণ এলো কোথা থেকে? আসলে কঠিন পদার্থের ভেতর ইলেক্ট্রন ও আয়নের যোগাযোগের ফলে ইলেক্ট্রনদের মধ্যে আপাতভাবে এক আকর্ষণী বলের সৃষ্টি হয়। যার সরলীকৃত একটা বিবরণ হল- আয়নরা ইলেক্ট্রনদের তুলনায় বহুগুণ বেশি ভরশালী এবং ইলেক্ট্রনদের চেয়ে অনেক মন্থরগতিতে নড়াচড়া করে। একটা ইলেক্ট্রন যখন দ্রুতগতিতে আয়নের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়, তাদের বিপরীত আধান বা চার্জের দরুণ আয়ন ঝুঁকে পড়ে ইলেক্ট্রনের দিকে। এতে খানিক বিকৃতি সৃষ্টি হয় আয়নদের সারিতে, যার ফলে এক জায়গায় বেশিমাত্রায় ধনাত্মক আধান বা পজিটিভ চার্জের প্রভাব ঘটে। দ্বিতীয় আরেকখানা ইলেক্ট্রন, যে একই পথ দিয়ে আসছিল, সে আকৃষ্ট হয় ওই ধনাত্মক আধানের জমায়েত দেখে। তাহলে ব্যাপারটা এরকম দাঁড়ালো যে, প্রথম ইলেক্ট্রন আকর্ষণ করল দ্বিতীয় ইলেক্ট্রনকে আয়নসারিতে বিকৃতি ঘটিয়ে। এ হেন আকর্ষণের মাধ্যমে দুটো ইলেক্ট্রন জুটি বাঁধে। এই জুটিদের ডাকা হয় কুপার জোড়া বলে।

চিত্র ১. কুপার জোড়া যেভাবে তৈরি হয় তার সরলীকৃত বিবরণ । দুটি ইলেক্ট্রনের মধ্যে আপাতভাবে এক আকর্ষক বল কাজ করছে ।

বিকর্ষণ ছাপিয়ে আকর্ষণের জয়:

আয়নদের মধ্যস্থতায় ইলেক্ট্রনদের ভেতর যে আকর্ষক বল তৈরি হতে পারে, এই ধারণা বি. সি. এস. তত্ত্ব আবিষ্কারের কিছু বছর আগে থেকেই পদার্থবিজ্ঞান জগতে আলোচিত হচ্ছিল। এই ধারণার জন্ম দেন হেরবার্ট ফ্র্যোলিখ। তারপর প্রশ্ন উঠেছিল – এই আকর্ষণ কি এতটাই জোরালো যে ইলেক্ট্রনদের স্বাভাবিক বিকর্ষণকে ছাপিয়ে উঠেও মোটের ওপর আকর্ষণ কার্যকরী হবে?
উত্তরটা জানা গিয়েছিল ডেভিড ব্যোম, ডেভিড পাইন্স ও জন বার্ডিনের পরবর্তী কাজ থেকে। একটি ইলেক্ট্রনের পার্শ্ববর্তী অন্যান্য ইলেক্ট্রনের সমূহ কিভাবে এই অবস্থাকে প্রভাবিত করবে, সেটা হিসেবের আওতায় এনে দেখা যায় যে ইলেক্ট্রনদের মধ্যে বিকর্ষণের প্রভাব এক্ষেত্রে উপেক্ষা করা যায়। এরপর ১৯৫৬ সালে লিওন কুপার প্রমাণ করে দেখান যে ইলেক্ট্রনদের মাঝে যদি আকর্ষক বল কাজ করে, তা সে যত ছোটই হোক না কেন, পরমশূন্য তাপমাত্রায় ইলেক্ট্রনসমূহের স্বাভাবিক দশা হবে জোড়ায় বাঁধা ইলেক্ট্রনদের সমষ্টি।
লিওন কুপারের এই কাজ বি. সি. এস. তত্ত্ব আবিষ্কারের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তার আগে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছিলেন যে ইলেক্ট্রনদের মধ্যে আকর্ষণ কাজ করলে এক নতুন অবস্থা পাওয়া যেতে পারে যা সাধারণ ধাতুর অবস্থা থেকে একেবারেই আলাদা। কিন্তু এটা জানা ছিল না যে এই নতুন দশা পেতে গেলে আকর্ষণের ন্যূনতম মাত্রা কত হওয়া প্রয়োজন। কুপার দেখালেন যে তা অপরিমেয় রূপে ক্ষুদ্র হলেও চলবে। মোটের ওপর বল আকর্ষণীয় হলেই পরমশূন্য তাপমাত্রায় নতুন দশার দেখা মিলবে।
এর এক বছর পরে, ১৯৫৭ সালে, জন বার্ডিন, লিওন কুপার ও জন রবার্ট শ্রীফার প্রকাশিত করলেন বিখ্যাত বি. সি. এস. তত্ত্ব। সবিস্তারে কোয়ান্টাম তত্ত্ব ও পরিসংখ্যানগত পদার্থবিদ্যার জটিল অনেক হিসেব কষে তাঁরা প্রমাণ করলেন ধাতুর মুক্ত ইলেক্ট্রনরা নিজেদের মধ্যে দুজন-দুজন করে জুটি বাঁধলে কুপার জোড়াদের সমষ্টি নিয়ে স্বল্প তাপমাত্রায় তৈরি হয় সুপারকন্ডাক্টার দশা।
অসংখ্য কুপার জোড়ার ছন্দবদ্ধ সমষ্টির ফল হল পদার্থের এই নতুন দশা–সুপারকন্ডাক্টিভিটি । এই দশায় কুপার জোড়ারা ভীষণভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধ। বিভিন্ন জোড়ারা চলে একে অপরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। তত্ত্বে প্রমাণিত হল এই অবস্থায় প্রতিরোধক্ষমতা হবে একদম শূন্য। জানা গেল তাপমাত্রা বাড়লে কিভাবে কুপার জোড়া তৈরি হওয়ার নানান ধাপে ছন্দপতন ঘটে। তাই পদার্থের তাপমাত্রা বাড়াতে থাকলে একসময় তা আর সুপারকন্ডাক্টার থাকে না, ফিরে যায় সাধারণ ধাতুর অবস্থায়।

একা ফার্মিয়ন, জোড়ায় বোসন:

ইলেক্ট্রনের একটি সহজাত (ইন্ট্রিনসিক) ধর্ম আছে যার নাম স্পিন। স্পিন হচ্ছে একটি কণার অন্তর্নিহিত কৌণিক ভরবেগ । কোয়ান্টাম তত্ত্বের উদ্ভবের আগে কণাদের স্পিন নামক ধর্ম নিয়ে বিজ্ঞানীদের কোনও ধারণা ছিল না। যদিও কোয়ান্টাম জগতের ঘটনা সঠিকভাবে বুঝতে গেলে উপযুক্ত গাণিতিক পদ্ধতি নিয়ে চর্চা করা প্রয়োজন, আপাতত সেদিকে যাচ্ছি না। এইটুকু মনে রাখা যেতে পারে যে স্পিনকে কল্পনা করা যায় একটি অভিমুখ সমন্বিত রাশি হিসেবে – এর বর্ণনা করা সম্ভব একটি মান ও একটি দিকনির্দেশের মাধ্যমে। কোনও কোনও কণার স্পিনের মান হচ্ছে পূর্ণসংখ্যা (যেমন ০, ১, ২ ইত্যাদি), আর বাকিদের ক্ষেত্রে পূর্ণসংখ্যার সাথে অর্ধেকের যোগফল (যেমন ১/২, ৩/২, ৫/২ ইত্যাদি)। প্রথম প্রকারের কণাকে বলা হয় বোসন, আর দ্বিতীয়টিকে ফার্মিয়ন। প্রসঙ্গত, যে দুই বিজ্ঞানীর নামে এই দুটি নামকরণ হয়েছে, তাঁরা হলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও এনরিকো ফার্মি। কণার সমষ্টিতে একেকটি কণার স্বভাব বর্ণিত হয় বিশেষ কিছু গুণের পরিমাণ দিয়ে। সাধারণত এই গুণগুলি হল শক্তি, ভরবেগ, স্পিন ইত্যাদি। এদের কোয়ান্টাম সংখ্যা বলে ডাকা হয়ে থাকে। কণারা যদি ফার্মিয়ন হয়, তাদের সমষ্টিতে কোনও দুটি কণার সমস্ত কোয়ান্টাম সংখ্যার মান সমান হওয়া সম্ভব নয়। এই নিয়মটিকে বলে পাউলি এক্সক্লুশান প্রিন্সিপল। বোসনদের জন্য এরকম বিধিনিষেধ নেই। এই নিষেধ না থাকার ফলে পরমশূন্য তাপমাত্রায় সমস্ত বোসন কণাকে পাওয়া যায় ন্যূনতম শক্তির অবস্থায়। ইলেক্ট্রন হচ্ছে ফার্মিয়ন, কারণ এর স্পিন হল ১/২। বি. সি. এস. তত্ত্ব অনুযায়ী একটি কুপার জোড়া যে দুটি ইলেক্ট্রনের সমন্বয়ে তৈরি হয়, তাদের স্পিন একে অপরের বিপরীত হওয়া বাধ্যতামূলক। দুই বিপরীত মেরুর স্পিন কোয়ান্টাম তত্ত্বের নিয়ম মেনে যোগ হওয়ার ফলে কুপার জোড়ার স্পিন মোটের ওপর দাঁড়ায় শূন্য। কুপার জোড়ার ধর্ম তাই অনেকাংশে বোসনের মত।

ইলেক্ট্রন জোড়ার সংহত দশা:

সাধারণ ধাতুর মুক্ত ইলেক্ট্রন ও দুটি ইলেক্ট্রনের মেলবন্ধনে তৈরি কুপার জোড়ার মধ্যে এটি এক বিরাট পার্থক্য। সুপারকন্ডাক্টারের কুপার জোড়ারা বোসন-জাতীয় ধর্মের কারণে তৈরি করে এক সংহত দশা (কোহেরেন্ট স্টেট), যেখানে তারা একে অপরের সাথে দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ। এই সংহত দশা ঠিক কিরকম? মনে করা যাক সেনাবাহিনীর প্যারেডের দৃশ্য, যা সাধারণতন্ত্র দিবসে দূরদর্শনের পর্দায় আমরা দেখি। দলের প্রত্যেকজন চলে সমান তালে, গতি ও ছন্দ এক রেখে। সুপারকন্ডাক্টার দশার কুপার জোড়াদের সংহতি এই জাতীয়। বি. সি. এস. তত্ত্ব থেকে জানা যায় কিভাবে এই সংহত দশা মাইসনার-অকসেনফেল্ড এফেক্টকে ব্যাখ্যা করতে পারে। যদি মনে রাখেন, মাইসনার-অকসেনফেল্ড এফেক্ট ছিল এইরকম: সুপারকন্ডাক্টারের ভেতর চৌম্বক ক্ষেত্র লোপ পায়। সুপারকন্ডাক্টারকে চুম্বকের কাছে রাখলে সে ঠিক বিপরীত এক ক্ষেত্র তৈরি করে, যাতে কেটেকুটে তার ভেতর মোট চৌম্বক ক্ষেত্র হয় শূন্য। মাইসনার-অকসেনফেল্ড এফেক্ট গবেষণাগারে আবিষ্কার হওয়ার পরে ১৯৩৫ সালে ফ্রিৎস লনডন ও হাইনৎস লনডন দেখিয়েছিলেন যে ম্যাক্সওয়েলের তড়িৎচৌম্বক তত্ত্ব ও সুপারকন্ডাক্টারে শূন্য প্রতিরোধক্ষমতার তথ্য ব্যবহার করে কিছু সমীকরণ নির্ধারণ করা যায়। তাদের সমাধান থেকে মাইসনার-অকসেনফেল্ড এফেক্টের অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করা সম্ভব। চৌম্বক ক্ষেত্র উপস্থিত থাকলে সুপারকন্ডাক্টা্রের পৃষ্ঠে বিদ্যুৎপ্রবাহ তৈরি হয়। সেই কারণে চারপাশে নতুন এক ক্ষেত্র আবির্ভূত হয় যা বহিরাগত ক্ষেত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত, ঠিক ততটাই যাতে ভেতরে মোট ক্ষেত্র শূন্য হয়ে যায়। ফ্রিৎস ও হাইনৎস লনডনের তত্ত্ব নির্মিত হয়েছিল ক্ল্যাসিকাল পদার্থবিজ্ঞানের ধাঁচে। আণুবীক্ষণীক স্তরে ইলেক্ট্রনের ধর্ম থেকে তাঁরা হিসেব শুরু করেননি। বি. সি. এস. তত্ত্ব দেখালো যে কুপার জোড়াদের সম্মিলিত দশার বর্ণনা থেকে উপরোক্ত সমীকরণগুলি স্থাপন করা সম্ভব। সম্পূর্ণ চিত্রটা পরিষ্কার হল। সুপারকন্ডাক্টিভিটি সংক্রান্ত বিবিধ গবেষণার জন্য নোবেল পুরষ্কারে সম্মানিত হয়েছেন বেশ কিছু বিজ্ঞানী সুপারকন্ডাক্টারের মধ্যে যা ঘটে চলেছে, পরীক্ষা করে গবেষণাগারে যা যা দেখতে পেয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা, বি. সি. এস. তত্ত্বে পাওয়া গেল তার পূর্ণ বিবরণ। এই অসাধারণ কীর্তির জন্যে বার্ডিন, কুপার ও শ্রীফার ১৯৭২ সালে নোবেল পুরষ্কারে সম্মানিত হন। এরপর সুপারকন্ডাক্টারের কাহিনীর যবণিকা পতন হয়ে গেল এমন ভাবার কিন্তু কারণ নেই। অনেক বড় এক চমক তোলা ছিল ভবিষ্যতের জন্যে।

প্রযুক্তিতে সুপারকন্ডাক্টার-এর ব্যবহার:

সুপারকন্ডাক্টারের প্রতিরোধক্ষমতা শূন্য হওয়ার কারণে প্রযুক্তিতে এর বহু উপযোগিতা রয়েছে। যেখানে অবিচ্ছিন্নভাবে বিরাট পরিমাণের বিদ্যুৎ সঞ্চালন করা প্রয়োজন, সেখানে এর জুড়ি মেলা ভার। খালি একটাই ব্যাপার – যে সরঞ্জামের মধ্যে দিয়ে বিদ্যুৎ যাবে তাকে বেশ ঠাণ্ডা করে রাখতে হবে, কারণ আমাদের স্বাভাবিক জগতের তাপমাত্রায় (অর্থাৎ ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ২৯৩ কেলভিনের আশেপাশে) থাকলে সুপারকন্ডাক্টার দশা লোপ পাবে। সুপারকন্ডাক্টিভিটির ইতিহাসের একদম শুরুর দিন থেকেই চেষ্টা চলছে এমন বস্তু আবিষ্কার করার যা কিনা এরকম তাপমাত্রাতেও শূন্য প্রতিরোধক্ষমতায় বিদ্যুৎবহনে সক্ষম হবে। সেরকম জিনিসের এখনও দেখা মেলেনি। সেই কথায় আসছি একটু পরে।
প্রতিরোধক্ষমতা শূন্য হওয়ার কারণে সুপারকন্ডাক্টার দিয়ে তৈরি বলয়াকার তারের মধ্যে দিয়ে বিদু্ৎপ্রবাহ চলতে থাকে অবিরাম, কোনো শক্তির যোগান ছাড়াই।
সুপারকন্ডাক্টারের সবথেকে প্রচলিত ব্যবহার হচ্ছে শক্তিশালী চুম্বক তৈরিতে। সুপারকন্ডাক্টার দিয়ে বানানো বলয়াকার তারের মধ্যে বিদ্যুৎ পাঠিয়ে বিরাট মাত্রার চুম্বকীয় ক্ষেত্র সৃষ্টি করা যায়। বিদ্যুৎপ্রবাহ ক্ষয় না পেয়ে অবিরাম চলতে থাকে এর ভেতর। তাকে ক্রমাগত শক্তির যোগান দেওয়ার দরকার পড়ে না। কোথায় কোথায় এর প্রয়োগ হয় দেখা যাক। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমআরআই . বলে একটি যন্ত্র ব্যবহৃত হয়। এমআরআই আদ্যক্ষরের অর্থ হচ্ছে ম্যাগনেটিক রেসোনান্স ইমেজিং। অনেকেই এটিকে চিকিৎসাকেন্দ্রে দেখে থাকতে পারেন। শরীরের নানা বৃত্তান্ত এই যন্ত্র বাইরে থেকে দেখতে পায়, তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ ও শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের মাধ্যমে। এখানে ব্যবহৃত হয় একটি প্রকাণ্ড বলয়াকার সুপারকন্ডাক্টার। আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে জাপানে আবিষ্কৃত এক অত্যাধুনিক ট্রেন প্রযুক্তি, যার নাম সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেটিক লেভিটেশন । ট্রেনের গায়ে লাগানো থাকে সুপারকন্ডাক্টার জাত চুম্বক আর রেললাইনের সঙ্গে থাকে বিভিন্নরকম বিদ্যুতবাহী তারের সারি। পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম মেনে ট্রেনের ওপর এক বলের সৃষ্টি হয় যা তাকে লাইনের একটুখানি ওপরে শূন্যে ভাসিয়ে রাখে । এতে প্রবল গতিতে ট্রেন চলাচল সম্ভব হয়। সারা পৃথিবীর মধ্যে দ্রুততম ট্রেন হওয়ার নজির গড়েছে এই প্রযুক্তি। এখনও পর্যন্ত এ নিয়ে অনেক পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে এবং আশা করা হচ্ছে শীঘ্রই একে দৈনন্দিন যাত্রী পরিসেবার কাজে লাগানো যাবে।

সুপারকন্ডাক্টার দশার তাপমাত্রা বৃদ্ধির সীমা

পদার্থবিজ্ঞানী ও রসায়নবিদরা বহুকাল ধরে নতুন নতুন পদার্থ বানিয়ে পরীক্ষা করে চলেছেন কী করে সুপারকন্ডাক্টারের দশা পরিবর্তনের তাপমাত্রা বাড়ানো যায়। একটা সময় ছিল যখন চিত্রটা হতাশাজনক হয়ে পরে। ১৯৭০ এর দশকের দিকে তাকানো যাক। Nb3Ge সূত্রের যৌগে ২৩ কেলভিনে সুপারকন্ডাক্টিভিটি দেখা যেত। সেই সময়ে এটাই ছিল সর্বোচ্চ তাপমাত্রায় অতিপরিবাহীতার নিদর্শন। ২৩ কেলভিন সাধারণ তাপমাত্রার দশ ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম। বি. সি. এস. তত্ত্বকে ভিত্তি করে কোনও ধাতুর সুপারকন্ডাক্টার দশা পরিবর্তনের তাপমাত্রা কত হবে, তা আন্দাজ করা সম্ভব। প্রধানত তিনটে জিনিস এই তাপমাত্রা নির্ধারণ করে – ইলেক্ট্রনদের ঘনত্ব, আয়নদের নড়াচড়ার ফলে পদার্থের অভ্যন্তরীন কম্পনের শক্তির মাত্রা (পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ফোনন’) ও ইলেক্ট্রনের সঙ্গে ফোননের ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়ার মাত্রা। এর প্রত্যেকটি যত বেশি হবে, তত উচ্চ তাপমাত্রায় সুপারকন্ডাক্টিভিটী পাওয়ার আশা করা যেতে পারে। সমস্যা হল, যা যা ধাতব পদার্থের কথা ভাবা যাচ্ছিল, হিসেব করে দেখা যাচ্ছিল তাদের কারও সুপারকন্ডাক্টার দশার তাপমাত্রা তখন যা জানা আছে তাকে ছাড়িয়ে বেশিদূর বাড়বে না। পরিচিত ধাতুদের বাইরে নতুন কী পদার্থ সৃষ্টি করা সম্ভব যার অভ্যন্তরীণ গঠনের ফলে ইলেক্ট্রনদের পারস্পরিক আকর্ষণ থেকে উষ্ণতর তাপমাত্রায় সুপারকন্ডাক্টিভিটি তৈরি হতে পারে? এই প্রশ্ন নিয়ে ভাবছিলেন য়োহানেস বেডনোর্টস ও কার্ল আলেক্সান্ডার ম্যূলার। কিছুটা তাত্ত্বিক গণনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আর কিছুটা নিজেদের অনুমাণ কাজে লাগিয়ে তাঁরা সুপারকন্ডাক্টিভিটির অস্তিত্ব খুঁজছিলেন ক্যূপ্রেট বলে একশ্রেণীর যৌগে। ক্যূপ্রেটরা গঠিত হয় তামা, অক্সিজেন ও অন্যান্য মৌলিক পদার্থের অণু সহযোগে। ১৯৮৬ সালে বেডনোর্টস ও ম্যূলার দেখতে পেলেন ৩৫ কেলভিন তাপমাত্রায় সুপারকন্ডাক্টিভিটি ঘটে Ba-La-Cu-O সূত্রের ক্যূপ্রেটে, যা হল তখনকার দিনে উষ্ণতম সুপারকন্ডাক্টারের নিদর্শন।

ক্যূপ্রেট-এর চাঞ্চল্যকর আচরণ:

যে যে পদার্থে সুপারকন্ডাক্টিভিটির ব্যাখ্যা বি.সি.এস তত্ত্ব থেকে পাওয়া যায়, তাদের মধ্যে সাধারণ তাপমাত্রায় ধাতুর গুণ ভালো করে দেখা যায়। ক্যূপ্রেটদের মোটেই সেই গোত্রে ফেলা চলে না। এই আবিষ্কার প্রমাণ করল প্রচলিত ধারণার বাইরেও অন্যান্য বস্তু রয়েছে যাদের মধ্যে সুপারকন্ডাক্টার দশার খোঁজ করা প্রয়োজন।
এমন যুগান্তকারী কাজের জন্যে বেডনোর্টস ও ম্যূলার নোবেল পুরষ্কার পেলেন ঠিক তার পরের বছর, ১৯৮৭-তে। ইতিমধ্যে বিজ্ঞানমহলে সারা পরে গেছে। নতুন সব ক্যূপ্রেটে সুপারকন্ডাক্টিভিটি খোঁজা শুরু হয়েছে। এই প্রচেষ্টা আরম্ভ হওয়ার সাথে সাথেই পাওয়া গেল ৯২.৪ কেলভিনে সুপারকন্ডাক্টিভিটি, Y-Ba-Cu-O তে। এই বস্তুটিকে তরল নাইট্রোজেনে (যার তাপমাত্রা ৭৭ কেলভিন) রাখলেও সে সুপারকন্ডাক্টার দশায় থাকে। বাতাস নাইট্রোজেনে ভরপুর, তাই তরল নাইট্রোজেন অনেক গুণ বেশি সহজলভ্য তরল হিলিয়ামের চেয়ে। প্রযুক্তিতে কাজে লাগার জন্যে সুপারকন্ডাক্টার একটা নতুন যুগে পা দিল। ক্যূপ্রেটে সুপারকন্ডাক্টিভিটির আবিষ্কার বিশ্বব্যাপী সাড়া ফেলে, প্রচার মাধ্যম তথা জনগণকে মৌলিক বিজ্ঞানচর্চা সম্পর্কে উৎসাহী করে তোলে।
ক্যূপ্রেটে সুপারকন্ডাক্টিভিটির আবিষ্কার কিরকম চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল তা একটা ঘটনা থেকে বোঝা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমেরিকান ফিজিকাল সোসাইটি মার্চ মাসে একটি বার্ষিক সম্মেলন আয়োজন করে যেটি পদার্থবিজ্ঞানের জগতে সুপ্রসিদ্ধ। নিউ ইয়র্কে ১৯৮৭ সালের এই সম্মেলনটি ছিল বিশেষভাবে স্মরণীয়। তখন ক্যূপ্রেট-সংক্রান্ত নিত্যনতুন আবিষ্কার হয়ে চলেছে আর এই নিয়ে বিজ্ঞানমহলে উত্তেজনা তুঙ্গে। সম্মেলনের আয়োজকরা উচ্চ তাপমাত্রায় সুপারকন্ডাক্টিভিটি নিয়ে একদিন একটি বিশেষ অধিবেশনের ব্যবস্থা করেন। এই অধিবেশন শুরু হয় সন্ধে সাড়ে সাতটায়। একান্ন জন তাঁদের বক্তব্য রাখেন আর অধিবেশন যখন শেষ হয় তখন বাজে রাত সোয়া তিনটে! শ্রোতার সংখ্যা ছিল প্রায় দুহাজার, সম্মেলনকক্ষে সকলের জায়গাও হয়নি। যাঁরা সেদিন উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায় যে সেই পরিবেশ ছিল উৎসবের মত। পদার্থবিজ্ঞানের সম্মেলনে এমন উন্মাদনা খুবই বিরল ঘটনা।

কেন অপেক্ষাকৃত উচ্চ তাপমাত্রাতেও সুপারকন্ডাক্টিভিটি সম্ভব?

সাধারণ বায়ুচাপের অধীনে সর্বোচ্চ তাপমাত্রায় সুপারকন্ডাক্টিভিটির নজির হচ্ছে ১৩৩ কেলভিন। Hg–Ba–Ca–Cu–O সূত্রের বস্তুতে তা দেখা যায়। কেন এই নতুন জিনিসগুলোতে এত উষ্ণ অবস্থাতেও এই দশা দেখা যাচ্ছে, সেই প্রশ্নটি বিজ্ঞানীদের আজও ভাবিয়ে চলেছে। আয়নের সঙ্গে ইলেক্ট্রনের আকর্ষণ থেকে ফোননকে কেন্দ্র করে ইলেক্ট্রনদের মধ্যে আকর্ষক বল সৃষ্টি হওয়ার যে কথা বি. সি. এস. তত্ত্বে আছে, এখানে সেই ব্যাখ্যা খাটে না। সম্পূর্ণ নতুন কোন ব্যাখ্যার প্রয়োজন। এই নিয়ে তিন দশক পরেও হয়ে চলেছে অনেক আলোচনা, অনেক বিতর্ক। এমন কোন সমাধান পাওয়া যায়নি যাকে সব দিক থেকে সঠিক ঘোষণা করে বিজ্ঞানীরা একমত হতে পারেন। বি. সি. এস. তত্ত্ব থেকে যে ধাতুদের ধর্ম নিয়ে হিসেব কষা যায়, তাদের মধ্যে খুঁজলে সাধারণ তাপমাত্রায় অতিপরিবাহীতা পাওয়ার আশা নেই তা বলেছি একটু আগে। একটা ব্যতিক্রম অবশ্য ভাবা গিয়েছিল – কঠিন হাইড্রোজেন। কঠিন পদার্থের অভ্যন্তরে আয়নদের বন্ধনের স্থিতিস্থাপক ধর্মের কারণে তারা স্পন্দনরত অবস্থায় থাকে। কঠিন পদার্থে এমন তরঙ্গ সহজাতভাবে উপস্থিত। বিভিন্ন প্রকারের স্পন্দনের সাথে জড়িয়ে রয়েছে শক্তির কিছু নির্দিষ্ট মাত্রা, যারই নাম ফোনন।
বি. সি. এস. তত্ত্বে ফোননদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুপার জোড়াদের সৃষ্টি হওয়ার মূলে রয়েছে ইলেক্ট্রনের সাথে আয়নদের শক্তি আদানপ্রদানের প্রক্রিয়া। হিসেব করলে দেখা যায় যে সুপারকন্ডাক্টিভিটির দশা পরিবর্তনের তাপমাত্রা নির্ভর করে ফোননের ওপর। হাইড্রোজেনের অণু মৌলিক পদার্থের মধ্যে সবচেয়ে হাল্কা – সেই কারণে কঠিন হাইড্রোজেনের অন্তর্নিহিত কম্পনের শক্তির মাত্রা বৃহৎ হওয়ার কথা। এই ঘটনার ভিত্তিতে ও অন্যান্য আরও কিছু কারণ বিবেচনা করে হিসেব করে দেখা যায় যে এই পদার্থে অতিপরিবাহীতা ঘটতে পারে অনেক উচ্চ তাপমাত্রায়।

সমস্যা হল, হাইড্রোজেনকে সাধারণ তাপমাত্রায় কঠিন ধাতুর অবস্থায় রাখতে গেলে তার ওপর বিপুল চাপ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। বাস্তব জগতে এই সুপারকন্ডাক্টারকে পাওয়া দুরূহ কাজ। সাম্প্রতিক কালে কয়েকজন গবেষক এই কাজটিকে অপেক্ষাকৃত সরল করার চেষ্টা করেছেন হাইড্রোজেনের বদলে কিছু হাইড্রোজেন-সংবলিত যৌগ নিয়ে পরীক্ষা করে, যাদের পরিবাহী ধাতুতে পরিণত করা তুলনায় সহজ। সেভাবেই জানা গেছে H2S-এর ওপর সাধারণ বায়ুচাপের থেকে ১৫ লক্ষ গুণ বেশি চাপ দিলে (যা কিনা পৃথিবীর কেন্দ্রে চাপের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ) তাতে সুপারকন্ডাক্টিভিটি দেখা যায় ২০৩ কেলভিনে। এখনও অবধি সর্বোচ্চ তাপমাত্রায় সুপারকন্ডাক্টিভিটির নিদর্শন এটাই। সাধারণ তাপমাত্রা থেকে যার দূরত্ব আর মাত্র ৯০ কেলভিন। আবিস্কারের ১১০ বছর পার হয়ে গেলেও এই বাকি পথটুকু যেতে আর কতদিন লাগবে? সেইটা আন্দাজ করার কোন উপায় নেই। সেই দিন না আসা পর্যন্ত সাধারণ তাপমাত্রায় সুপারকন্ডাক্টিভিটির সন্ধানে পৃথিবীর নানা প্রান্তে পরীক্ষা নিরীক্ষা অবিরাম চলতেই থাকবে। আর সে জন্যই নতুনদের সর্বদাই স্বাগত জানায় এই শাখাটি ।

Refference:
Alexandro, A. S. & Edwards, P. P. (2000). High Tc cuprates: a new electronic state of matter? Physica C, 331, pp.97-112
Bardeen, j; Cooper, L. N. & Schrieffer, J.R.(1957). Theory of superconductivity. Phys. Rev. 108, 5, pp.1175-1204
Bendorz, J. G. & Muller, K. A. (1986). Possible high Tc superconductivity in the Ba-La-Cu-O system. Zeischrift fur Physik B, Condensed Matter, 64, 2,pp.189-193
Theory of Superconductivity; Tfy-3.491 (5 ocr.) PV, 2+2. HUT. Fall, 2006; N. B. Kopnin- Low temparature Laboratory, Helsinki University of technology.
Room temparature superconductivity by Adir Moyses Luiz; Instituto de Fisica, Universidade Federal do Rio de Jeneiro, Brazil.

লিখেছেন:
জিওন আহমেদ
তড়িৎ ও তাড়িত কৌশল বিভাগ(ইইই),১৭ ব্যাচ
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়(চুয়েট)