কাপ্তাইয়ে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার বাস্তব প্রয়োগ দেখলেন চুয়েট শিক্ষার্থীরা

নাজমুল কবির সিয়াম:

পাহাড়, হ্রদ ও সবুজ প্রকৃতির মনোমুগ্ধকর পরিবেশে গড়ে ওঠা দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রকৌশল কাঠামো ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের কার্যক্রম সরাসরি পর্যবেক্ষণ করলেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) এর পানি সম্পদ কৌশল বিভাগের শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কেও ধারণা লাভ করেন তারা।

গত ২০ জুন (শনিবার) চুয়েটের পানি সম্পদ কৌশল বিভাগের ২০২১-২২ এবং ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে একটি বিশেষ শিক্ষা সফর অনুষ্ঠিত হয়। শ্রেণীকক্ষের তাত্ত্বিক জ্ঞানকে বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করা এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, বাঁধ পরিচালনা ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা দেওয়াই ছিল শিক্ষামূলক এ ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্য।

সকালে চুয়েট ক্যাম্পাস থেকে শিক্ষার্থীদের বহনকারী গাড়িটি কাপ্তাইয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। পাহাড়ের বুক চিরে এগিয়ে চলা আঁকাবাঁকা পথ আর কাপ্তাই হ্রদের নীল জলরাশিকে সঙ্গী করে বাসটি পৌঁছে যায় দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে।

বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পৌঁছে শিক্ষার্থীরা এর নিয়ন্ত্রণ কক্ষ, বাঁধ, পানি নির্গমন পথ এবং টারবাইন ইউনিটগুলো পরিদর্শন করেন। শ্রেণিকক্ষের বই খাতায় পড়া জলপ্রবাহ বিজ্ঞান, টারবাইনের কলাকৌশল কিংবা পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার জটিল সমীকরণগুলো বাস্তবে কীভাবে কাজ করে, তা সরাসরি অবলোকনের সুযোগ পান শিক্ষার্থীরা। কেন্দ্রের দায়িত্বরত প্রকৌশলীরা শিক্ষার্থীদের বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়াটি বিশদভাবে বুঝিয়ে বলেন। বিশেষ করে পানির বিভব শক্তিকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে টারবাইন ঘোরানো হয় এবং উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে কীভাবে সরবরাহ করা হয়, সে বিষয়ে প্রকৌশলীদের বিস্তারিত ব্যাখ্যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বাস্তব প্রক্রিয়া সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করেন।

জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে শিক্ষার্থীদের গন্তব্য ছিল কাপ্তাই ড্যামের স্পিলওয়ে। সেখানে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, সে বিষয়ে তারা বিস্তারিত জানতে পারেন।

উক্ত বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম আরিফ বলেন, “কাপ্তাই হাইড্রোইলেকট্রিক পাওয়ার প্ল্যান্ট পানি সম্পদ কৌশল বিভাগের একজন শিক্ষার্থীর জন্য একটি জীবন্ত ক্লাসরুম, যা আমাদের একাডেমিক থিওরি ও বাস্তব প্রকৌশলের মধ্যে নিখুঁত মেলবন্ধন তৈরি করে। এখানে ক্লাসরুমে শেখা স্পিলওয়ে ডিজাইন, পেনস্টক ও টারবাইনের মেকানিজম, বার্নোলির সমীকরণ এবং ওয়াটারশেড ম্যানেজমেন্টের মতো জটিল তাত্ত্বিক বিষয়গুলো চোখের সামনে বাস্তব রূপ নেয়। একই সাথে, রিজার্ভার সেডিমেন্টেশন, ফ্লাড কন্ট্রোল এবং নদী শাসনের মতো প্র্যাক্টিক্যাল চ্যালেঞ্জগুলো সরাসরি উপলব্ধি করা যায়, যা একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের পাঠ্যবই এর জ্ঞানকে মাঠপর্যায়ের কাজের উপযোগী করে তোলে এবং ভবিষ্যতে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অবদান রাখার বাস্তবমুখী আত্মবিশ্বাস জোগায়।”

শিক্ষা সফরের গুরুত্ব তুলে ধরে বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ তামিম বলেন,”বাংলাদেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হিসেবে কাপ্তাই ড্যাম দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও জলসম্পদ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। শিক্ষা সফরের মাধ্যমে আমাদের শিক্ষার্থীরা ড্যামের নকশা, পরিচালনা পদ্ধতি, জলাধার ব্যবস্থাপনা, স্পিলওয়ের কার্যকারিতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কে সরাসরি জেনেছে। এতে পাঠ্যপুস্তকে শেখা তত্ত্বের সঙ্গে বাস্তব প্রকৌশল চর্চার সমন্বয় ঘটেছে বলে আমি মনে করি। এ ধরনের শিক্ষাসফর শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধান দক্ষতা, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং পেশাগত দৃষ্টিভঙ্গি বিকাশে সহায়তা করে। পাশাপাশি অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ তাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য অনুপ্রেরণা জোগায়।”