সাব্বির হোসাইনঃ-
উত্তপ্ত চুল্লির লেলিহান আগুন। চারদিকে ভারী যন্ত্রপাতির অবিরাম গর্জন। বিশালাকার রোলারের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে লালচে-তপ্ত ইস্পাতের দণ্ড, আর মুহূর্তেই তা রূপ নিচ্ছে নির্মাণকাজে ব্যবহৃত শক্তপোক্ত রডে। নিরাপত্তা সরঞ্জাম পরে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীরা বিস্ময়ভরা চোখে দেখছেন ইস্পাত তৈরির প্রতিটি ধাপ। পাঠ্যবইয়ে পড়া তত্ত্ব যেন বাস্তবে জীবন্ত হয়ে উঠেছে তাঁদের সামনে। এমনই এক ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়েছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) শিক্ষার্থীরা।
গত ২০ জুন(শনিবার) চুয়েট অটোমোটিভ অ্যান্ড মোবিলিটি সোসাইটির উদ্যোগে আয়োজিত হয় এক বিশেষ শিল্পকারখানা পরিদর্শন যার অংশ হিসেবে চুয়েট শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটে অবস্থিত বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ইস্পাত প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম রোলিং ইউনিট পরিদর্শন করে।
কেবল উৎপাদনই নয়, শিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির নেপথ্যের কারিগরি দিকগুলোও গভীরভাবে খুঁটিয়ে দেখেন শিক্ষার্থীরা। কীভাবে বিশেষ যান্ত্রিক ব্যবস্থা ভারী মেশিনগুলোকে সচল ও মসৃণভাবে চালু রাখে, সেই প্রক্রিয়াটি তারা সরাসরি দেখার সুযোগ পান। পাশাপাশি অনেক ওপর থেকে ভারী মালপত্র ওঠানো-নামানোর বিশাল যন্ত্রগুলো কত নিপুণভাবে সামলানো হয় তা পর্যবেক্ষণ করেন। এছাড়াও প্রতিটি উৎপাদন পর্যায়ে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে বিএসআরএম যে কঠোর গুণমান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনুসরণ করে, তার বিস্তারিত ধারণাও পান শিক্ষার্থীরা।
শ্রেণিকক্ষে শেখা তাত্ত্বিক জ্ঞানের সাথে বাস্তব শিল্পক্ষেত্রের কাজের এমন চমৎকার মেলবন্ধন শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা।
যন্ত্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জাওয়াদ ইবনে আতিক নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, “এই ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যুর আমাদের জন্য অত্যন্ত শিক্ষণীয় ও বাস্তবমুখী অভিজ্ঞতা ছিল, যা আমার ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একজন যন্ত্রপ্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে আমরা বইয়ে যে তাত্ত্বিক বিষয়গুলো পড়ি, এই পরিদর্শনের মাধ্যমে সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ সরাসরি দেখার সুযোগ পেয়েছি। বাস্তব কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করার ফলে শিল্পক্ষেত্রের প্রকৃত পরিবেশ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা লাভ করেছি। এই অভিজ্ঞতা আমাকে ভবিষ্যতে কোন দিকে নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে চাই, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা দিয়েছে।”
পুরো আয়োজন নিয়ে চুয়েট অটোমোটিভ অ্যান্ড মোবিলিটি সোসাইটির সভাপতি মোহাম্মদ নূর ই মাহমুদ জায়েদ বলেন, “এই শিল্পকারখানা পরিদর্শনটি মূলত আমাদের নবীন সদস্যদের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল। তবে তাদের উৎসাহ ও শেখার আগ্রহ দেখে আমি নিজেও অনেক অনুপ্রাণিত হয়েছি। বিএসআরএম এর মতো একটি বড় শিল্পকারখানার কার্যক্রম সামনে থেকে দেখা সত্যিই অসাধারণ। শ্রেণিকক্ষে শেখা বিষয়গুলোকে বাস্তবে দেখার সুযোগ পাওয়ায় শেখার ব্যাপারটা আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে। আমার বিশ্বাস প্রকৌশল জীবনের শুরুতেই এই ধরনের শিল্পকারাখানায় পদচারণা একজন শিক্ষার্থীর দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাভাবনাকে অনেকটাই সমৃদ্ধ করতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “এই আয়োজনের পেছনে আমাদের সংঠনের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান স্যারে এবং অন্যতম অনুষদ উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. জামাল উদ্দিন আহমেদ স্যারের আন্তরিক সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। পাশাপাশি বিএসআরএম কর্তৃপক্ষকেও আন্তরিক ধন্যবাদ তাদের উষ্ণ আতিথেয়তা ও সহযোগিতার জন্য।”