রাউজানে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আতঙ্কে চুয়েট শিক্ষার্থীরা

ফাইয়াজ কৌশিকঃ-

দিনের বেলায় শিক্ষার্থী, যানবাহন ও দোকানপাটের কোলাহলে মুখর থাকে বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন সড়কগুলো। সারাদিন ক্লাস, ল্যাব ও পরীক্ষা শেষে সন্ধ্যা গড়াতেই অনেক শিক্ষার্থী ফিরে যান বাড়িতে, কেউবা আশপাশের ভাড়া বাসায়। রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পাসের বাইরের বেশ কিছু সড়ক ও এলাকা হয়ে পড়ে তুলনামূলক নির্জন। এ নির্জনতার মাঝেই রাত ১০ টার পর চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসগুলো ক্যাম্পাসে ফিরে আসে।

তবে সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন এলাকায় ঘটে যাওয়া কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সেই চেনা পথগুলোকেই এখন অনেক শিক্ষার্থী দেখছেন উদ্বেগ ও শঙ্কার চোখে। একসময় শান্ত ও নিরিবিলি পরিবেশের জন্য চট্টগ্রামের রাউজানে অবস্থিত চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) ক্যাম্পাস এখন যেন নিজ শিক্ষার্থীদের কাছেই নিরাপত্তা-উদ্বেগের আরেক নাম হয়ে উঠছে।

গত শনিবার বেলা দেড়টার দিকে রাউজানের স্থানীয় নেতা মাসুদুল হক চুয়েটের পাশেই পাহাড়তলী বাজারের একটি ওষুধের দোকানের সামনে অবস্থান করছিলেন। এ সময় সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে পাঁচ থেকে সাতজন অস্ত্রধারী এলাকাটিতে আসে। এরপর মাসুদুলকে লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি করে অটোরিকশা করেই ঘটনাস্থল ত্যাগ করে তারা। মাসুদুলের মাথাসহ শরীরের একাধিক স্থানে গুলি লাগে এবং ঘটনাস্থলেই তিনি নিহত হন। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। এ ঘটনার জেরে বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করেন স্থানীয়রা। এসময় ক্যাম্পাসের পাশেই এমন ঘটনা ঘটে যাওয়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। অনেকে সেদিন শহরে যাওয়ার কথা থাকলেও আতঙ্কে ক্যাম্পাসে অবস্থান করেন। আবার আতঙ্কের মধ্য দিয়েই অনেকে শহরগামী বাসে ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন।

শুধু এ ঘটনাই নয়, বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে রাউজানে রাজনৈতিক হানাহানি ও বিভিন্ন বিরোধে ২০টির বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এ সময়ের মধ্যে শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছেন সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ। এসব ঘটনার জেরে সন্ধ্যার পর ক্যাম্পাসের বাইরে চলাফেরা, শহর থেকে রাতে বাসে ফেরা কিংবা আশপাশের এলাকায় বসবাস—সবকিছু নিয়েই বাড়ছে দুশ্চিন্তা। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর শিক্ষার্থীদের অনেকেই বলছেন, শুধু শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ নয়, নিরাপদ ক্যাম্পাস নিশ্চিত করাও এখন সময়ের অন্যতম দাবি।

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রী হুজায়ফা তাহসিন চুয়েটনিউজ২৪কে বলেন, “রাউজানের সাম্প্রতিক ঘটনায় ক্যাম্পাস এবং এর আশেপাশের এলাকাকে খুবই অনিরাপদ মনে হচ্ছে। শহর থেকে আসা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত এই সড়ক দিয়েই যাতায়াত করতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ বাসে হামলার মতো ঘটনা ঘটলে এর দায় নেবে কে? গত শনিবার আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অনুষ্ঠান ছিল যেখানে বাইরের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। এমন ঘটনা আমাদের ক্যাম্পাস ও এর আশেপাশের এলাকা সম্পর্কে তাদের কাছেও নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে। তাই এ বিষয়টি উদ্বেগজনক।”

একই বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের আরেক শিক্ষার্থী ফাইজুল কবীর আবরার চুয়েটনিউজ২৪কে বলেন, ” আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় শহর থেকে অনেকটা দূরে। বিগত দেড়-দুবছরে আমরা এই রাউজান এলাকায় অনেক হত্যাকান্ড ঘটতে দেখেছি। এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে আমরা আতঙ্ক বোধ করছি। আশা করি প্রশাসন এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নিবে।”

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ অধিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম চুয়েটনিউজ২৪কে জানান, ” আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পরিচয়পত্র দেখানো বাধ্যতামূলক করার চিন্তা করছি। শিক্ষার্থীদেরকেও এ ব্যাপারে সহযোগিতা করতে হবে। আর আমাদের বেশ কিছু শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসের বাইরে থাকে, তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারেও আমরা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে বসব। আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার ব্যাপারে সর্বদা সচেতন।”