নাজিফা তাসনিম জিফা
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) ৮ম বারের মতো আয়োজিত “আন্তর্জাতিক কনফারেন্স অন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি (আইসিএমইআরই ২০২৫)” এর শেষ দিন আজ। ১০-১২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত এই তিন দিনব্যাপী সম্মেলন দেশের যন্ত্রকৌশল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও উন্নত প্রযুক্তি-গবেষণার অগ্রগতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রথম দিন (১০ ডিসেম্বর) সকাল ১১ টায় কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সৈয়দ মুহাম্মদ আবুল ফয়েজ এবং গেস্ট অব অনার ছিলেন চুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাহমুদ আবদুল মতিন ভূইয়া। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সম্মেলনের সম্পাদক যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ সানাউল রাব্বী। এছাড়া আরও বক্তব্য রাখেন জাপানের সাগা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আকিও মিয়ারা ও নরওয়ের আগডার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তরে ভেহুস।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কোরআন পাঠ, শুভেচ্ছা বক্তব্য ও স্বাগত প্রবন্ধ পাঠের পর প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথিদের ভাষণের মাধ্যমে সম্মেলন আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধিত হয়। একই দিনে শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজিত ইভেন্ট, পেপার প্রেজেন্টেশন, কীনোট বক্তৃতা ও বিশেষ সেশন অনুষ্ঠিত হয়।
সম্মেলনে মোট জমা পড়া গবেষণাপত্রের সংখ্যা ছিল ৩১৭টি, যেগুলোর মধ্য থেকে কঠোর সমবায় মূল্যায়নের পর ২৪১টি গৃহীত হয়। গৃহীত গবেষণাপত্রগুলো বাংলাদেশের ২৫টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৬টি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের দ্বারা উপস্থাপিত হয়, যা সম্মেলনের বহুজাতিক স্বরূপ এবং গবেষণার গুণগত মানের প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মোট ৭জন বক্তা গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতা ও সাম্প্রতিক অগ্রগতি উপস্থাপন করেন। এছাড়া অনুষ্ঠিত শিল্প-একাডেমিয়া সেশনে প্রায় ২০টি শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান অংশ নিয়ে প্রযুক্তি স্থানান্তর, শিল্প-চাহিদা অনুসারে গবেষণা ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতা প্রসঙ্গে বিস্তারিত মতবিনিময় করে।
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন (১১ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় চুয়েট প্রশাসনিক ভবনের কাউন্সিল রুমে সমাপনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে সমাপনী অনুষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর টেকনিক্যাল কমিটির সেক্রেটারি ও মেকাট্রনিক্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ এর বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. প্রসঞ্জীত দাশ স্বাগত বক্তব্য উপস্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে দেশ-বিদেশের প্রতিনিধিরা তাঁদের মতামত ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। বিশেষ অতিথিদের বক্তব্য শেষে প্রধান অতিথি চুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাহমুদ আবদুল মতিন ভূইয়া অনলাইনে যুক্ত থেকে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন। অতিথিদের ক্রেস্ট প্রদান শেষে টেকনিক্যাল কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। কনফারেন্স ডিনারের মাধ্যমে পুরো অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়।
এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সর্বশেষ কার্যক্রম হিসেবে আজ (১২ ডিসেম্বর) অংশগ্রহণকারীরা কক্সবাজার কনফারেন্স ট্যুরে অংশগ্রহণ করেন। এই বহির্গমনটি গবেষক, শিল্পপ্রতিনিধি ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেটওয়ার্ক গঠন, পরিচিতি বিনিময় ও সাংস্কৃতিক সংলাপে সমৃদ্ধি আনে।
আহছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা ফজলুল করিম চুয়েটনিউজ২৪-কে বলেন, ‘এখানকার ব্যবস্থা খুব ভালো। অংশগ্রহণ করতে পেরে ভালো লাগছে।’
আয়োজকদের পক্ষ থেকে সম্মেলনের চেয়ার ও চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির জানান, “২০১১ সাল থেকে শুরু হয়ে অষ্টমবারের মতো এই আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আইসিএমইআরই ২০২৫ সফলভাবে আয়োজন করে আমরা চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগ গর্বিত। যন্ত্রকৌশল ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সাধন এবং মানব কল্যানে তাদের সফল ব্যবহারিক প্রয়োগের লক্ষ্যে আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে দেশ-বিদেশের গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের এক সফল মিলন মেলা বসেছিল। সকল গবেষক, অংশগ্রহণকারী, আয়োজক কমিটির সকল সদস্য, আর্থিক সহায়তা দানকারী সকল শিল্প প্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবক ও মিডিয়া পার্সোনাল এবং সর্বোপরি ক্রমাগত সহযোগিতা জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি।”
সমগ্র সম্মেলনে আনুমানিক অংশগ্রহণকারী ছিলেন প্রায় ৩৫০ জন। এতে দেশের ও বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যাপক, গবেষক, শিক্ষক, পিএইচডি এবং পোস্টগ্র্যাজুয়েট ছাত্রছাত্রী, শিল্পখাতের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আয়োজিত পোস্টার প্রেজেন্টেশন, আইডিয়েশন চ্যালেঞ্জ, ডিজাইন কনটেস্ট ও রোবারেস প্রতিযোগিতা নতুন প্রতিভাদের সুযোগ দিয়েছে বিষয়ভিত্তিক বাস্তবসম্মত দক্ষতা প্রদর্শনের এবং সম্ভাব্য শিল্প-শিক্ষা সংযোগ গঠনের। সম্মেলনের অংশ হিসেবে টেকনিক্যাল সেশনগুলোর পাশাপাশি পৃষ্ঠপোষকদের অংশগ্রহণও ছিল নজরকাড়া।
উল্লেখ্য, ৮ম আইসিএমইআরই ২০২৫ চুয়েটকে একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা মঞ্চে পরিণত করেছে যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক জ্ঞানীর সংমিশ্রণে প্রযুক্তি-উদ্ভাবন, শিক্ষাবর্ষণ ও শিল্প ভিত্তিক গবেষণার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আয়োজকেরা আশা ব্যক্ত করেছেন।