একজন কিশোর কুমার দাসের গল্প

নাজমুল হাসানঃ-
প্রতি বছর হাজারো যুবক এ দেশের প্রকৌশল বিদ্যাপীঠ গুলো হতে পাশ করে বের হয়। এদের একটা বড় অংশ দেশেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যাস্ত হয়ে পড়ে। আর বাকিরা স্বপ্নের টানে পাড়ি দেয় দূর প্রবাসে। পাশ্চাত্যের চাকচিক্যের মাঝে হাজারো সাফল্যের ভিড়েও তাদের কেউ কেউ হয়ে পড়েন একা। তখন এতসব সাফল্য তাদের কাছে তুচ্ছ মনে হয়। তাদেরই একজন ছিলেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) প্রাক্তন শিক্ষার্থী কিশোর কুমার দাস।

ল্যাটিন আমেরিকাতে বসবাস কালে ১ম স্ত্রীর সাথে তার বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটে। এ বিচ্ছেদের বেদনা তাকে দুমড়েমুচড়ে খাচ্ছিলো। তখন একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে পরিচালকের দায়িত্বে থাকলেও দিন শেষে ছিলেন চরম একা। এ বেদনা থেকে বাঁচতে তিনি বহুবার আটলান্টিক মহাসাগরের ঝাঁপ দিতেও চেয়েছিলেন। কিন্তু, তার আগে এতো দিনকার কামানো অর্থের তো একটা গতি করতে হবে। তখন তার মাথায় আসে একটি দাতব্য সংস্থা তৈরির চিন্তা। সেখান থেকেই শুরু।

শুরু করেন দেশের অন্যতম স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। তার প্রতিষ্ঠানটি এবছর একুশে পদক লাভ করে। আর, কিশোর কুমার দাস পান মানবসেবার স্বীকৃতি। মূলত, করোনা অতিমারি চলাকালীন সময়ে তার ফাউন্ডেশনটি মানবসেবায় এক অনন্য নজির স্থাপন করে দেশবাসীর ভালোবাসা ও আস্থা কুড়িয়ে নেয়।

২০১৩ সালে ল্যাটিন আমেরিকার দেশ পেরুতে বসেই চালু করেন ফাউন্ডেশনটি। শুরুটা করেন নিজ জেলা নারায়ণগঞ্জে জেলেপাড়ার শিশুদের পড়ানোর মাধ্যমে। এ কাজে সাহায্য নেন দেশে থাকা তার বোন ও কয়েকজন বন্ধুর। তিনি দেশে আসেন একবছর পর। মূলত, ছিন্নমূল শিশুদের জন্য আনন্দময় একটি স্কুল ও পাঠাগার বানিয়ে শুরুটা করেছিলেন। আনন্দের মাধ্যমে শেখা, এই মূলমন্ত্র থেকে আসে বিদ্যানন্দ নামটি। প্রথমদিকে শুধু শিক্ষা নিয়ে কাজ করলেও পরে তারা বিনামূল্যে খাবার, এতিমখানা নির্মাণ ও বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রভৃতি প্রকল্প শুরু করেন।

কিশোর কুমার দাস চুয়েটের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের ‘০১ ব্যাচের’ শিক্ষার্থী ছিলেন। ২০০৫ সালে চুয়েট হতে পাশ করেন তিনি। দরিদ্র পরিবারের সন্তান কিশোর টিউশনি করে নিজের পাশাপাশি পরিবারের ভরনপোষণও করতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। রাজনীতিও করতেন। পাশাপাশি, শিক্ষা সমাপনী উৎসবের কনভেনরের দায়িত্বও পালন করেছিলেন।

এখনোও সময় পেলে ছুটে আসেন চুয়েট প্রাঙ্গণে। চুপিসারে যান, আবার চুপিসারেই ফিরে আসেন। খুব ভোরে খালি পায়ে হাঁটেন। কয়েকদিন আগেও গিয়েছিলেন। যেখানে যেখানে তার স্মৃতিময় দিনগুলো কাটতো, সেসব জায়গায় গিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। চুয়েট নিয়ে উনার স্বপ্নটাও অন্যরকম। স্বপ্ন দেখেন এখানে অনুজরা সবাই সহনশীল হবে প্রাণির প্রতি।

তাকে চুয়েটের বর্তমান শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে কিছু পরামর্শ দিতে বললে উনি জানান, আমি নিজেকে সুপার হিউম্যান মনে করিনা পরামর্শ দেওয়ার জন্য। শুধু বলবো, আমাদের প্রত্যেকের ব্যাচেই কেউ না কেউ থাকে, যে টাকার অভাবে হয়তো পরীক্ষার ফি দিতে পারছে না। চুপিসারে গিয়ে তাঁদের যেন সহায়তা করে কেউ। কে বলবে হয়তো সেও একদিন বড় কিছু হতে পারে।