নাজিফা তাসনিম জিফা ও অনুরাশা রাফানা:
হাতে জীবনবৃত্তান্ত, মনে ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের পরিকল্পনা। কেউ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলছেন, কেউ উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্পর্কে জানছেন, আবার কেউ নিজেদের বিশ্লেষণী ও উপস্থাপনা দক্ষতা প্রদর্শন করছেন প্রতিযোগিতার মঞ্চে। তিন দিন ধরে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) ক্যাম্পাসে এমনই প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর ছিল ‘ক্যারিয়ার ফেস্ট ২০২৬’। চুয়েট ক্যারিয়ার ক্লাব আয়োজিত এ উৎসব ১১ থেকে ১৩ জুন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়। প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান, উচ্চশিক্ষা এবং নেতৃত্ব বিকাশের নানা আয়োজনকে কেন্দ্র করে তিন দিনের এ উৎসব শিক্ষার্থীদের জন্য হয়ে ওঠে অভিজ্ঞতা অর্জন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার এক অনন্য সুযোগ।
উৎসবের কার্যক্রম শুরু হয় ১১ জুন। এদিন চীনের বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে চুয়েট শিক্ষার্থীদের জন্য একটি টেকনিক্যাল সেশন এবং চাকরি পরীক্ষার আয়োজন করে। প্রযুক্তি খাতে আগ্রহী শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নিয়ে নিজেদের দক্ষতা যাচাইয়ের সুযোগ পান।
১২ জুন বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় উৎসবের মূল আয়োজন। দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সেশনে রবি আজিয়াটা লিমিটেডের টেকনিক্যাল সেশন, বিসিএস প্রস্তুতি বিষয়ক আলোচনা এবং ব্যাংক চাকরির প্রস্তুতি নিয়ে দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়। একই দিনে অনুষ্ঠিত হয় উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ‘প্রেজেন্টএক্স’ এর সেমিফাইনাল ও চূড়ান্ত পর্ব। রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংভিত্তিক এ উপস্থাপনা প্রতিযোগিতার সেমিফাইনালে অংশ নেয় ২৩টি দল। সেখান থেকে নির্বাচিত ৬টি দল চূড়ান্ত পর্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। প্রতিযোগিতা শেষে তড়িৎ ও ইলেক্ট্রনিক কৌশল (ইইই) বিভাগের দল ‘সিনসিয়ারলি ইয়োরস’ চ্যাম্পিয়নের গৌরব অর্জন করে। ১ম রানার-আপ হয় পুরকৌশল বিভাগের দল ‘সিভিল নেক্সট জেন’ এবং ২য় রানার-আপ হয় কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের দল ‘রাইজিং রেডিয়েন্টস’।
দ্বিতীয় দিনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য আয়োজন ছিল উৎসবের প্রধান পৃষ্ঠপোষক এন মোহাম্মদ গ্রুপের উদ্যোক্তা বিষয়ক সেশন। উক্ত সেশনে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিরা নিজেদের প্রতিষ্ঠানের পথচলা, চ্যালেঞ্জ অতিক্রমের অভিজ্ঞতা এবং সফলতার গল্প তুলে ধরেন।
উৎসবের শেষ দিন ১৩ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্কেটবল মাঠে অনুষ্ঠিত হয় চাকরি মেলা। এতে অংশ নেয় দেশের ১১টি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান – নাভানা গ্রুপ, বিএসআরএম, ফয়’স লেক কনকর্ড, সিনজেনটা, প্রাণ, মুসপানা, জোতুন, আইডিপি, ইস্পাহানি, কেওয়াই স্টিল এবং এন মোহাম্মদ গ্রুপ। মেলায় শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করেন, কর্মপরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে জানেন এবং সম্ভাব্য চাকরির জন্য জীবনবৃত্তান্ত জমা দেন। একই দিনে অনুষ্ঠিত হয় উচ্চশিক্ষা বিষয়ক সেশন, যেখানে দেশ-বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ নিয়ে আলোচনা করা হয় এবং কর্পোরেট বিষয়ক সেশন, যেখানে এনার্জিপ্যাক ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড কর্পোরেট চাকরি নিয়ে আলোচনা করে।
বিকালে অনুষ্ঠিত সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাহমুদ আব্দুল মতিন ভূইয়া। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন ক্যারিয়ার ফেস্টের প্রধান পৃষ্ঠপোষক এবং যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. জামাল উদ্দিন আহমেদ। তাঁরা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য প্রদান করেন এবং ‘প্রেজেন্টএক্স’ এর বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। এ সময় বিভিন্ন শিক্ষককে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। পাশাপাশি ক্যারিয়ার ফেস্ট আয়োজনের কনভেনর হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ২০ ব্যাচের শিক্ষার্থীদেরও সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।
সমাপনী অনুষ্ঠান শেষে আয়োজনের সর্বশেষ পর্ব হিসেবে অনুষ্ঠিত হয় র্যাফেল ড্র। আয়োজক কমিটির সদস্য ও উৎসবের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেন। এর মধ্য দিয়েই পর্দা নামে তিন দিনব্যাপী ‘ক্যারিয়ার ফেস্ট ২০২৬’-এর।
চুয়েট ক্যারিয়ার ক্লাবের সভাপতি দিব্য জ্যোতি ঘোষ চুয়েটনিউজ২৪-কে বলেন, “চুয়েট ক্যারিয়ার ক্লাবের উদ্যোগে সপ্তমবারের মতো অনুষ্ঠিত “চুয়েট ক্যারিয়ার ফেস্ট ২০২৬” শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যারিয়ার সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। জব ফেয়ারে ১০টিরও বেশি কোম্পানি অংশ নিয়ে ক্যাম্পাসেই সিভি জমা ও চাকরির সুযোগ তৈরি করে। আয়োজনে ক্লাবের প্রধান পৃষ্ঠপোষক অধ্যাপক ড. জামাল উদ্দীন আহমেদ, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সজল চন্দ্র বণিক, উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মেহেদী হাসান চৌধুরীসহ সকল শিক্ষক উপদেষ্টার সার্বিক সহযোগিতা ছিল।”
কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী লাইবা তাবাসসুম জানান, “প্রতি বছরের মতো এবারও চুয়েট ক্যারিয়ার ফেস্ট ২০২৬-এর আয়োজন অসাধারণ ছিল, প্রতিটি সেশন আমাদের চুয়েটিয়ানদের জন্য শিক্ষণীয় ও উপকারী ছিল। এবারের ফেস্টে এতগুলো স্বনামধন্য স্পন্সর, কর্পোরেট পার্টনার, কন্ট্রিবিউটর এবং বিপুল সংখ্যক প্রতিযোগীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে এক দারুণ উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। আমি মনে করি, তিন দিনের এই সফল ফেস্ট চুয়েটিয়ানদের কর্পোরেট দুনিয়ায় প্রস্তুত করতে নিঃসন্দেহে এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে।”
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পাঠ্যজ্ঞানকে বাস্তব কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এবারের ক্যারিয়ার ফেস্ট প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার নানা সুযোগের মাধ্যমে চুয়েট শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করেছে।