মো. মিসবাহ উদ্দিন
ক্লাস, ল্যাব ও পরীক্ষার প্রস্তুতির মাঝেই ভিন্ন এক কাজে ব্যস্ত একদল তরুণ। কেউ কাজ করছেন গাড়ির নকশা নিয়ে, কেউ সংগ্রহ করছেন প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও উপকরণ। আবার কেউ ব্যস্ত বিভিন্ন হিসাব-নিকাশ ও কারিগরি বিষয় নিয়ে। চোখে ক্লান্তির ছাপ, তবু বুকজুড়ে একরাশ স্বপ্ন – নিজের হাতেই গড়বে একটি ফর্মুলা কার।
এই স্বপ্ন থেকেই চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) শিক্ষার্থীদের সংগঠন চুয়েট অটোমোটিভ অ্যান্ড মোবিলিটি সোসাইটির উদ্যোগে যাত্রা শুরু করে ‘বিজয় ৭১’। আন্তর্জাতিক ‘ফর্মুলা স্টুডেন্ট’ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের লক্ষ্যে নিজেদের নকশায় একটি পূর্ণাঙ্গ ফর্মুলা কার তৈরির কাজ করছেন তারা।
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজওয়ানুল আবেদীন, প্রধান কারিগরি কর্মকর্তা উমর ফারুক, দল সমন্বয়কারী মো. আবদুল্লাহ শাহরিয়ার, বিপণন ও ব্যবস্থাপনা প্রধান এস এম ফাহিম শাহরিয়ার, ব্যবসা বিষয়ক প্রধান রাফসান রশীদ চৌধুরী এবং অর্থ ও পৃষ্ঠপোষক প্রধান সোহাগ তালুকদার, পাঁচজন দলনেতা ও আটজন সদস্যসহ মোট ১৯ জন এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
কাগজের নকশা এবার বাস্তবের কাঠামোয়
কাগজের ড্রয়িং বা কম্পিউটারের পর্দায় জন্ম নেওয়া একটি গাড়ি অসংখ্য হিসাব, নকশা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে বাস্তব রূপ পায় । ‘বিজয় ৭১’ দলের সদস্যরা ইতোমধ্যে গাড়ির মূল কাঠামো চ্যাসিসের নকশা ও কম্পিউটারভিত্তিক পরীক্ষার কাজ শেষ করেছেন। চলছে চ্যাসিস তৈরির কাজ। এরপর ধাপে ধাপে গাড়িতে যুক্ত হবে সাসপেনশন, ব্রেক, ইলেকট্রিক্যাল সিস্টেম, ইঞ্জিন, পাওয়ারট্রেন ও ড্রাইভট্রেন। প্রতিটি অংশের কাজ শেষ হওয়ার পর সেগুলোকে একসঙ্গে নিয়ে তৈরি হবে সম্পূর্ণ গাড়িটি। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী দেড় থেকে দুই বছরের মাথায় চুয়েটের রাস্তায় দাপিয়ে বেড়াবে এই গাড়ি।
নিজেদের অর্থেই প্রাথমিক কাজ
একটি ফর্মুলা কার তৈরিতে প্রয়োজন হয় নানা ধরনের মেটেরিয়াল, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিগত সুবিধা। ফলে অর্থায়ন শুরু থেকেই ‘বিজয় ৭১’-এর জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ। তবে অর্থের সংকট তাদের থামিয়ে দিতে পারেনি। এখন পর্যন্ত কোনো বড় স্পন্সর ছাড়াই দলের ১৯ সদস্য নিজেদের অর্থ দিয়েই প্রকল্পের অনেক খরচ চালিয়ে যাচ্ছেন। মেটেরিয়াল কেনা থেকে শুরু করে ওয়ার্কশপের বিভিন্ন কাজ – অনেক ক্ষেত্রেই নিজেদের অর্থ ব্যবহার করছেন তারা। তবে প্রকল্পের কাজ যত এগোবে, খরচও বাড়বে। একটি পূর্ণাঙ্গ ফর্মুলা কার তৈরির জন্য আরও বড় পরিসরে অর্থ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা প্রয়োজন। তাই দেশের কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা এবং পৃষ্ঠপোষকতার প্রত্যাশা করছে দলটি। তাদের বিশ্বাস, সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে শুধু প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়াই নয়, ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে।
শ্রেণিকক্ষের জ্ঞান যখন হাতে ধরা যায়
বইয়ের পাতায় পড়া প্রকৌশলের বিভিন্ন বিষয় বাস্তবে প্রয়োগ করার সুযোগ পাচ্ছেন ‘বিজয় ৭১’-এর সদস্যরা। কোনো একটি অংশ কীভাবে নকশা করতে হবে, সেটি কতটা শক্তিশালী হওয়া দরকার কিংবা সিমুলেশনে পাওয়া ফলাফল বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে – এসব বিষয় নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন করছেন তারা। এর পাশাপাশি দলগতভাবে কাজ করা, দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া, সীমিত সম্পদে সমস্যার সমাধান করা এবং একটি বড় প্রকল্পকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়ার অভিজ্ঞতাও অর্জন করছেন তারা। ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা কিংবা আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতাগুলো তাদের জন্য বড় সম্পদ হয়ে উঠবে বলেই মনে করছেন দলের সদস্যরা।
লক্ষ্য আরো উন্নত প্রযুক্তি
বর্তমান প্রকল্পে ‘বিজয় ৭১’ একটি অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিন-চালিত ফর্মুলা কার তৈরির দিকে এগোচ্ছে। তবে তাদের পরিকল্পনা শুধু এই একটি গাড়িতেই সীমাবদ্ধ নয়। ভবিষ্যতে নিজেদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বৈদ্যুতিক গাড়ি কিংবা আরও পরিবেশবান্ধব ফর্মুলা কার তৈরির স্বপ্নও রয়েছে তাদের। প্রথম গাড়িটি তাদের কাছে গন্তব্য নয়, বরং আরও বড় যাত্রার প্রথম ধাপ।
পরিশিষ্ট
একটি গাড়ি তৈরি করেই ক্ষান্ত হতে চান না ‘বিজয় ৭১’ এর সদস্যরা। তাদের লক্ষ্য এমন একটি অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সংস্কৃতি তৈরি করা যা অনুজ শিক্ষার্থীদের এই প্রকল্পকে আরও এগিয়ে নিতে অনুপ্রেরণা যোগাবে।
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজওয়ানুল আবেদীন চুয়েটনিউজ২৪-কে বলেন,
"আমরা এমন একটি দক্ষ ও মেধাবী কর্মীবাহিনী তৈরি করতে চাই, যারা পরবর্তী প্রজন্মে এই প্রজেক্ট-এর দায়িত্ব নিয়ে নতুন প্রযুক্তি প্রয়োগ করে গাড়িটিকে আরও উন্নত করবে। শেষ পর্যন্ত আমরা চুয়েট এর শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে চাই যে, আমরা চাইলে সবচেয়ে জটিল এবং শ্রমসাধ্য প্রকৌশল প্রকল্প-ও তৈরি করতে পারি।"