অধ্যাপক সায়েমের প্রশংসায় ১২ আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ অধ্যাপকের বিবৃতি

জারীন তাসমীন সাবা:

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে যখন শিক্ষার্থীরা রাস্তায়, তখন হাজার হাজার মাইল দূরে বসে কলম ধরেছেন আরেক দল মানুষ – যাঁরা কখনো চুয়েটের ক্লাসরুমে বসেননি, কিন্তু চিনেছেন এর সাবেক উপাচার্যকে গবেষণার টেবিলে, সম্মেলনের মঞ্চে কিংবা যৌথ প্রকল্পের আলোচনায়। যুক্তরাজ্য থেকে নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া থেকে নরওয়ে – ১২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ জন অধ্যাপক অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্যের পদে পুনর্বহালের আহ্বান জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন।

একজন মানুষ, ১৩টি ভিন্ন গল্প

চিঠিগুলো পড়লে বোঝা যায়, প্রতিটি স্বাক্ষরকারীর সঙ্গে সায়েমের সম্পর্কের গল্প আলাদা। কারও কাছে তিনি ছাত্র, কারও কাছে সহকর্মী, কারও কাছে সহ-গবেষক।

নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির অধ্যাপক মাসুদ খানের কাছে সায়েম ছিলেন একজন পিএইচডি শিক্ষার্থী, যাঁকে তিনি গবেষক হিসেবে গড়ে উঠতে দেখেছেন। পরে সায়েম বিভাগীয় প্রধান থেকে উপাচার্যের দায়িত্বে আসেন। অস্ট্রেলিয়ার সানশাইন কোস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন অধ্যাপক আমান ও-ও ছিলেন তাঁর তত্ত্বাবধায়ক। তিনি লেখেন, ‘সাবেক ছাত্র হিসেবে তাঁর অর্জনে আমি গর্বিত।’

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ওকলাহোমা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ রবিউল হোসাইনের সঙ্গে সম্পর্কটা দুই দশকের পুরোনো। ২০০৩ সালে, যখন তিনি নিজে সদ্য প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন চুয়েটে, তখন সায়েম ছিলেন তাঁর শিক্ষার্থী। বর্তমানে তাঁরা যৌথভাবে মস্তিষ্কের অ্যানিউরিজম চিকিৎসার জৈবপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য চলাচল-সহায়ক যন্ত্র তৈরির গবেষণা এবং মার্কিন ফেডারেল সংস্থার কাছে যৌথ গ্র্যান্ট আবেদনেও তাঁরা একসঙ্গে কাজ করেছেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

সম্মেলনের মঞ্চ থেকে সমঝোতার টেবিল

আন্তর্জাতিক সহযোগিতার যে গল্পগুলো চিঠিতে উঠে এসেছে, তার একটি বড় অংশ জুড়ে আছে সম্মেলন, কর্মশালা ও অনুদান প্রস্তাবের মঞ্চ।

ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক প্রশান্ত দত্ত, যিনি নিজেও চট্টগ্রামের সন্তান – লেখেন, ২০১৯, ২০২১, ২০২৩ ও ২০২৫ সালের আইসিএমইআরই সম্মেলনে তাঁকে মূল বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন সায়েম। ২০২৫ সালের সম্মেলনে বিদেশি অধ্যাপকদের নিয়ে একটি প্যানেল আলোচনাও আয়োজন করা হয়, যাতে শিক্ষার্থীরা সরাসরি আন্তর্জাতিক গবেষকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ পান।

স্কটল্যান্ডের রবার্ট গর্ডন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মামদুদ হোসাইনের কাছে আবার সায়েম একজন ধারাবাহিক উদ্যোক্তা। ‘ধারণাকে আলোচনার টেবিলে না রেখে বাস্তব উদ্যোগে রূপান্তর করার ক্ষমতা তাঁর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য,’ লেখেন তিনি। ব্রিটিশ কাউন্সিলে জমা দেওয়া সমতা, বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি-বিষয়ক প্রকল্প প্রস্তাবের প্রসঙ্গও তিনি উল্লেখ করেন। একই ব্রিটিশ কাউন্সিলের অনুদানের আরেকটি প্রস্তাব নিয়ে কাজ করেছেন বার্মিংহাম সিটি ইউনিভার্সিটির ড. মোস্তাফিজ রহমান। তিনি সায়েমকে ‘গঠনমূলক, সহজলভ্য ও দায়বদ্ধ’ সহকর্মী হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ক্যাম্পাসের ভেতরের গল্পও উঠে এসেছে

শুধু আন্তর্জাতিক প্রকল্প নয়, চিঠিগুলোতে উঠে এসেছে ক্যাম্পাসের ভেতরের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও। ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক নন্দিতা বিশ্বাস তাঁর প্রয়াত বাবার স্মরণে ২০২৪ সালে চালু হওয়া ‘এসকেবি মেমোরিয়াল স্কলারশিপ’-এর কথা উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বৃত্তিটি বাস্তবায়নে প্রশাসনিক জটিলতা পেরোতে সায়েমের নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি চুয়েটের পুরোনো লাইব্রেরি ভবনকে গবেষণা ও সহযোগিতা কেন্দ্রে রূপান্তরের উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন, যা ১৪৪তম সিন্ডিকেট সভায় অনুমোদন পেয়েছে বলে চিঠিতে বলা হয়েছে।

নরওয়ের এগডার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৌমেন রুদ্র লেখেন নরপার্ট-অর্থায়িত ‘কেয়ার’ প্রকল্পের কথা (২০২২–২০২৭)। তাঁর চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রকল্পটির আওতায় প্রায় ৪০ শিক্ষার্থী ও ২০ শিক্ষক বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি নরওয়েজীয় দূতাবাসের সহায়তায় গড়ে ওঠা নবায়নযোগ্য জ্বালানি হাবের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে সরাসরি আবেদন

চিঠিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন উটাহ ইউনিভার্সিটির ড. মো. আবদুস সালামের। চুয়েটকে প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের আন্দোলনে সক্রিয় থাকা এই সাবেক শিক্ষক সমিতির সভাপতি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্দেশে চিঠিটি লেখেন। এতে তিনি সায়েমকে রাজনীতি-নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষক হিসেবে উল্লেখ করে সাম্প্রতিক উপাচার্য নিয়োগ বাতিল এবং সায়েমকে পুনর্বহালের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়ার অনুরোধ জানান।

এক দাবিতে বাঁধা কণ্ঠ

১৩টি চিঠি, ১২টি দেশের নয় – বরং ১২টি বিশ্ববিদ্যালয় ও ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপট – তবু চিঠিগুলোতে একটি অভিন্ন দাবি উঠে এসেছে: সায়েমের নেতৃত্বে চুয়েট যে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করেছে, তা যেন অব্যাহত থাকে এবং তাঁকে উপাচার্যের পদে পুনর্বহাল করা হয়।

অস্ট্রেলিয়ার ম্যাককুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক নাজমুল হুদার ভাষায়, ‘তাঁর নেতৃত্বের ধরন আর শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর প্রকৃত যত্ন তাঁকে করে তুলেছে এমন একজন মানুষ, যিনি শিক্ষার্থীদের জীবনে অর্থবহ ও দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনতে সক্ষম।’

ক্যাম্পাসের আন্দোলন যখন ষষ্ঠ দিনে গড়িয়েছে, তখন এসব আন্তর্জাতিক চিঠি আন্দোলনকারীদের দাবির পক্ষে দেশের বাইরের শিক্ষাবিদদের বক্তব্যও সামনে এনেছে। চুয়েটের সাবেক উপাচার্যকে ঘিরে চলমান বিতর্কে এসব চিঠি এখন আন্তর্জাতিক একাডেমিক যোগাযোগ ও সহযোগিতার প্রসঙ্গটিকেও আলোচনায় নিয়ে এসেছে।