উপাচার্যের ডাকা অনলাইন সিন্ডিকেট সভায় যেসব সিদ্ধান্ত হলো

ইবাদ হোসেন:

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে চলমান অচলাবস্থায় বন্ধ রয়েছে ক্লাস-পরীক্ষাসহ অধিকাংশ একাডেমিক কার্যক্রম। এ পরিস্থিতি নিরসন ও শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় চালুর লক্ষ্যে তিনটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষার্থীদের দ্রুত শ্রেণিকক্ষে ফেরার আহ্বান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে সমন্বিত আলোচনা এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত বা পরামর্শক কমিটি গঠনের সুপারিশ পাঠানো।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সন্ধ্যা ছয়টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমের আহ্বানে অনলাইনে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় ছয়জন সদস্য অংশ নেন। এর আগে তিনি মুঠোফোনে সদস্যদের বার্তা পাঠিয়ে অংশগ্রহণের বিষয়টি তিনি জানান।

সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অচলাবস্থা নিরসন, শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের ক্ষতি কমানো এবং ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা কার্যক্রম দ্রুত চালুর আহ্বান:

সিন্ডিকেটের প্রথম সিদ্ধান্তে চলমান অচলাবস্থার কারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়া এবং সম্ভাব্য সেশনজটের ঝুঁকি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক স্বার্থ, শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ও ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে দ্রুত নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রমে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অংশীজনকে শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় চালুর উদ্যোগে ভূমিকা রাখার কথা বলা হয়েছে। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হওয়া এবং ভবিষ্যতে সেশনজটের আশঙ্কা থেকেই এ আহ্বান জানানো হয়েছে বলে সিদ্ধান্তে উল্লেখ করা হয়।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও অংশীজনদের নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ:

দ্বিতীয় সিদ্ধান্তে ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক একাডেমিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এ লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সমন্বিত আলোচনা ও মতবিনিময় সভা আয়োজনের প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে। এতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।

আলোচনার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও দাবি পর্যালোচনা করে বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ খোঁজা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়াই এ সিদ্ধান্তের লক্ষ্য।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কমিটি গঠনের সুপারিশ:

তৃতীয় সিদ্ধান্তে চলমান অচলাবস্থা নিরসন এবং শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম টেকসইভাবে পুনরায় চালুর লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত বা পরামর্শক কমিটি গঠনের জন্য বিশেষভাবে সুপারিশ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রস্তাবিত কমিটি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত পর্যালোচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সংকটের গ্রহণযোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রস্তাব দেবে। এর মাধ্যমে বিদ্যমান সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি ভবিষ্যতে শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা এবং ক্যাম্পাসে স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখার পথ নির্ধারণের প্রত্যাশা করা হয়েছে।

ছয় সদস্যের সভায় অংশ নিলেন যারা:

চুয়েটের সিন্ডিকেটে মোট সদস্য ১৭ জন। তবে সহ-উপাচার্যের পদটি শূন্য রয়েছে। শুক্রবারের অনলাইন সভায় উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম ছাড়াও অংশ নেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) মো. মাহবুবুল হক পাটোয়ারী, চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান এবং অবসরপ্রাপ্ত মহাপরিচালক (টিএসসি) ও বিটিবিএলের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) প্রকৌশলী খান আতাউর রহমান।

সভায় চুয়েটের কোনো শিক্ষক সদস্য উপস্থিত ছিলেন না বলে জানিয়েছেন সভায় অংশ নেওয়া সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান।

চুয়েটনিউজ২৪-কে তিনি বলেন, উপাচার্য ছাড়া চুয়েটের অন্য কোনো শিক্ষক সদস্য সভায় উপস্থিত ছিলেন না। সভার বিষয়ে উপাচার্য নিজেই বিস্তারিত জানাবেন বলে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি।

এদিকে সিন্ডিকেটের সদস্যসচিবের দায়িত্বে থাকা রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. শেখ মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির দাবি করেছেন, তিনি আগেই রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন। তাই সিন্ডিকেটের সদস্যসচিব হিসেবেও আর দায়িত্বে নেই। সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানতে উপাচার্যের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

প্রসঙ্গত,গত ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। এ নিয়োগের প্রতিবাদে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে সর্বাত্মক শাটডাউন কর্মসূচি পালন করে আসছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহাল এবং নতুন উপাচার্যের নিয়োগ বাতিল করতে হবে।একই দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাংশও কর্মবিরতি ও অসহযোগ কর্মসূচি পালন করছেন। ফলে বন্ধ রয়েছে ক্লাস-পরীক্ষাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ একাডেমিক কার্যক্রম। এ পরিস্থিতির মধ্যে গত সোমবার উপাচার্য ভবনে অবরুদ্ধ হন অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমসহ ১১ জন। প্রায় ৩০ ঘণ্টা পর মঙ্গলবার জেলা প্রশাসন ও পুলিশের সহায়তায় তাঁকে সেখান থেকে বের করে নেওয়া হয়। হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে ফিরে যান। সেখান থেকেই শুক্রবার সন্ধ্যায় অনলাইনে সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করেন।