পুরোনো ও নতুন চুয়েটের ফ্রেমে সাংবাদিক সমিতির স্টল

অনুরাশা রাফানাঃ-

চারপাশে ভীড়, অসংখ্য স্টল আর সেগুলোকে ঘিরে রঙিন আলো, মাইকের ঘোষণা – এসবেরই এক কোণে আড়াই বছরের একটি শিশুর হাত হঠাৎ থেমে গেল এক দিকে। সন্ধ্যায় পরিবার নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার (সমন্বয়) মুহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম। মেয়ের ইশারা অনুসরণ করে তিনি দেখলেন, দুই সারিতে ঝুলছে দেশের দৈনিক সংবাদপত্রগুলোর নাম। মেয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছে চুয়েট সাংবাদিক সমিতির স্টলের দিকে।

"নিজেও একসময় পেশাদার সাংবাদিক ছিলাম বিধায় মেয়েও হয়তোবা খানিকটা জিনগত বৈশিষ্ট্য পেয়েছে," হাসতে হাসতে বলছিলেন তিনি।

বাইরে থেকে চাকচিক্য নেই বটে। কিন্তু ভেতরে ঢুকতেই দৃষ্টিনন্দন ফটোফ্রেমে চোখে পড়ে “আদি থেকে অন্ত”, “সাংবাদিক সমিতি: একাল-সেকাল”, “বি.আই.টি. থেকে চুয়েট”-এমন সব শিরোনাম। একপাশে সাদাকালো কোনো পুরোনো ক্যাম্পাসের দৃশ্য, তার পাশেই রঙিন ছবি। মাঝে সময়ের ব্যবধান অনেক-বদলেছে নাম, বদলেছে ক্যাম্পাস, বদলেছে প্রজন্ম। তবু এই বদলে যাওয়া দৃশ্যগুলোর ফাঁকে ফাঁকে রয়ে গেছে কিছু গল্প, যা বলতেই চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) ২৪তম বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের ক্লাব ফেস্টে হাজির হয়েছিল চুয়েট সাংবাদিক সমিতি।

সময়ের এক ছোট্ট জানালা

বাস্কেটবল মাঠের ১৩ নম্বর স্টল। ঢুকতেই চোখে পড়ে চুয়েটের অতীত আর বর্তমানের নানা স্মৃতি পাশাপাশি সাজানো। ছবির ফ্রেমে ধরা আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পথচলার বিভিন্ন বাঁক। পুরোনো তথ্য, ক্যাম্পাসের স্মৃতি আর ইতিহাসের নানা ভাঁজ মিলিয়ে গোটা স্টলটাই যেন হয়ে উঠেছিল সময়ের এক ছোট্ট জানালা।

সেখানে ছিল সাংবাদিক সমিতির নিজস্ব ম্যাগাজিন ‘দর্পণ’ আর বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত পত্রিকার সংগ্রহ। পেছনের পর্দায় নিঃশব্দে বয়ে যাচ্ছিল জুলাই আন্দোলন-সম্পর্কিত ভিডিও-সময়ের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল দর্শনার্থীদের।

চুয়েট সাংবাদিক সমিতির নিজস্ব উদ্যোগে তৈরি করা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রামাণ্যচিত্র দেখছেন প্রদীপ স্কুলের শিক্ষার্থীরা

তবে চুয়েটের গল্পের শুরু হয়ে অনেক আগে। ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হিসেবে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি ১৯৮৬ সালে রূপ নেয় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বা বিআইটি চট্টগ্রামে। এরপর ২০০৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে নতুন পরিচয় পায় চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সংক্ষেপে চুয়েট। বিআইটি থেকে চুয়েট হয়ে ওঠার সেই দীর্ঘ পথচলার গল্পই যেন ফ্রেমে বাঁধা হয়ে রাখা হয়েছিল সাংবাদিক সমিতির স্টলে।

রাশেদুল ইসলাম তখন হারিয়ে গিয়েছিলেন সেই দৃশ্যপটে, "ভিতরে গিয়ে যখন দৃষ্টিনন্দন ফটোফ্রেমে 'আদি থেকে অন্ত', 'সাংবাদিক সমিতি: একাল-সেকাল', 'বি.আই.টি. থেকে চুয়েট' প্রভৃতি দেখতে থাকি, তখন মনের অজান্তেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই আন্দোলন-সংগ্রামমুখর দৃশ্যপটে হারিয়ে গেলাম। যা এতোকাল শুনে এসেছি, সেই সংগ্রামের নোটবুকের সামনে বাপ-মেয়ে নিজেদেরও ইতিহাসের সেলুলয়েডে ফ্রেমবন্দী করলাম।"

তাঁর কথায়, "বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় অংশ ছিল ক্লাব ফেস্ট। কর্তৃপক্ষ চাইলেই যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানগুলো অনেক বেশি অংশগ্রহণমূলক করা সম্ভব, এবারের আয়োজন তা প্রমাণ করে দিয়েছে।"

মেয়ের সঙ্গে চুয়েট সাংবাদিক সমিতির স্টল দেখছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার (সমন্বয়) মো. রাশেদুল ইসলাম

যে অতীত তাঁরা দেখেননি

বর্তমান প্রজন্মের অনেক শিক্ষার্থীর কাছে বিআইটির সময়টা কেবল বইয়ের পাতার ইতিহাস। তাঁরা চেনেন আজকের চুয়েটকে -পরিচিত ক্যাম্পাস, বিভাগ, হল আর প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবন। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠানের বর্তমানের পেছনে লুকিয়ে থাকে দীর্ঘ এক অতীত, যা প্রতিদিন চোখে পড়ে না। সেই অদেখা অতীতকেই যেন কাছ থেকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছিল এই স্টল।

পুরকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফাহিম নুজহাত জাহিনের কাছে তাই এটি ছিল নিছক একটি স্টলের চেয়ে বেশি কিছু। তিনি বলেন, "একজন চুয়েটিয়ান হিসেবে সাংবাদিক সমিতির এই স্টলটি আমার কাছে শুধু একটি স্টল ছিল না, বরং নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীতকে কাছ থেকে দেখার একটি সুযোগ ছিল। পুরোনো ছবিগুলো, বিআইটির সময়ের স্মৃতি আর বর্তমান চুয়েটের ছবি পাশাপাশি দেখে মনে হয়েছে, আমাদের পরিচিত এই ক্যাম্পাসের পেছনে কত দীর্ঘ ইতিহাস ও কত গল্প জড়িয়ে আছে। বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের আয়োজনে এমন একটি উদ্যোগ সত্যিই আমাদের শিকড়কে নতুন করে চিনতে সাহায্য করে।"

স্টলজুড়ে তখন নানা ছন্দের নীরবতা আর মগ্নতা। কেউ থমকে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন পুরোনো ছবি, কেউ ঝুঁকে পড়ে পড়ছিলেন তথ্যের ফলক। কেউ উল্টে দেখছিলেন ‘দর্পণ’-এর পাতা, আবার কারও চোখ আটকে ছিল পেছনে চলতে থাকা ভিডিওর দৃশ্যে।

চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. বসির জিসানের চোখেও এই আয়োজন ধরা দিয়েছিল ভিন্নভাবে। তিনি বলেন, "এক কথায় বলতে গেলে, বিশ্ববিদ্যালয় দিবস এমনই হওয়া উচিত। যেখানে শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকবে, তাদের চিন্তা-ভাবনা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী ধারণাগুলো প্রকাশের সুযোগ থাকবে। শিক্ষার্থীদের এসব চিন্তা ও উদ্ভাবন যদি এভাবে দৃশ্যমানভাবে তুলে ধরা না হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের আয়োজনটি পরিপূর্ণতা পায় না। এবারের আয়োজনটি সত্যিই চমৎকার হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন আইডিয়া যেভাবে দৃশ্যমান হয়েছে, এতে তারা ভবিষ্যতে এ ধরনের সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী কাজে আরও বেশি আগ্রহী হবে বলে আমি মনে করি। আমি চুয়েট সাংবাদিক সমিতির স্টলেও গিয়েছি। সেখানে সমিতির বিভিন্ন কার্যক্রম, প্রকাশনা, পোস্টার ও আলোকচিত্রের মাধ্যমে তাদের কাজগুলো যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তা বেশ ভালো লেগেছে।"

দর্পণের ভেতর আরেক দর্পণ

সমাজের দর্পণ হিসেবে সংবাদমাধ্যমের পরিচিতি বহু পুরোনো। কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট্ট পরিসরে সেই দর্পণ হয়ে ওঠার গল্পটা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। চুয়েটের বিভিন্ন সময়ের সংকট, বিআইটি থেকে চুয়েটে রূপান্তরের পথ কিংবা শিক্ষার্থীদের নানা দাবি-দাওয়ার কথা তুলে ধরতে সাংবাদিকদের ভূমিকার প্রসঙ্গও উঠে আসে সমিতির ইতিহাসে।

শুধু শিক্ষার্থীরাই নন, স্টলটি নজর কেড়েছিল সাংবাদিকতা ও ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত মানুষদেরও। তাঁদের চোখে এই আয়োজন ছিল শুধু অতীতের স্মৃতি তুলে ধরার উদ্যোগ নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা সময় ও ঘটনাকে সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে সংরক্ষণ করার একটি প্রয়াস।

চুয়েট সাংবাদিক সমিতির স্টলে বিভিন্ন সময়ের সংবাদপত্র ও প্রকাশনার ফ্রেমে উঠে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা সময়ের গল্প

মাছরাঙা টেলিভিশনের সাংবাদিক মোহসেনাত শিহাব বলেন, "সমাজের দর্পণ হিসেবে পরিগণিত হওয়া সংবাদমাধ্যম অনেক সময়ই সমাজের যথাযথ দর্পণ হতে পারে না। তবে চুয়েট সাংবাদিক সমিতি যে বিশ্ববিদ্যালয়টির সত্যিকারের দর্পণ হয়ে উঠেছে, তা চুয়েট সাংবাদিক সমিতির স্টল দেখলেই বোঝা যায়।"

তাঁর মতে, প্রকৌশলবিদ্যার পড়াশোনার পাশাপাশি সাংবাদিকতায় যুক্ত শিক্ষার্থীদের এই পথচলাও প্রশংসার দাবি রাখে। তিনি আরও বলেন, "নতুন কোনো আবিষ্কার অথবা প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের পাশাপাশি তারা লেখনীর মাধ্যমে সমাজের ক্ষত সারাতেও এগিয়ে আসছে।"

একই সুর শোনা যায় শোয়েব রহমানের কথাতেও। একসময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাবেক সভাপতি ছিলেন তিনি। বর্তমানে রিপোর্টার হিসেবে কাজ করছেন এখন টেলিভিশনে। তিনি বলেন, "ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা যে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্পণ, এই স্টলটি তার অনন্য প্রমাণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা, সম্ভাবনা ও অর্জনগুলোকে গুলোকে অত্যন্ত শৈল্পিক উপায়ে প্রদর্শনের এই আইডিয়াটি দারুণ লেগেছে। চুয়েট সাংবাদিক সমিতির এমন দায়িত্বশীল ও নান্দনিক কাজ সত্যিই আমাদের অনুপ্রাণিত করে। চুয়েট সাংবাদিক সমিতির পথচলা আরও সাফল্যমণ্ডিত হোক।"

প্রশাসনের পক্ষ থেকেও মিলেছিল একই স্বীকৃতি। জনসংযোগ দপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ফজলুর রহমান বলেন, "চুয়েট সাংবাদিক সমিতি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সুখ-দু:খের দীর্ঘ সঙ্গী। বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অত্র প্রতিষ্ঠানের যাত্রার পর থেকেই সংবাদচিত্র প্রকাশসহ নানামুখী কার্যক্রম চালিয়ে আসছে, এসবের ক্রমবিকাশ সাংবাদিক সমিতির স্টলে নানাভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে দেখে ভালো লাগলো। এ ধরনের সৃষ্টিশীল ও নান্দনিক কাজগুলো অব্যাহত থাকুক এই কামনা করছি।"

ফ্রেম থেকে ফ্রেমে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে

বিআইটি থেকে চুয়েটের এই দীর্ঘ পথচলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু মানুষ, বহু সময়, অসংখ্য গল্প-ক্যাম্পাসের অর্জন, সংকট, আন্দোলন, দাবি-দাওয়া আর প্রতিদিনের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন, সবকিছু মিলিয়ে।

‘বি.আই.টি. থেকে চুয়েট’ শিরোনামে পুরোনো সংবাদপত্র ও আলোকচিত্রে তুলে ধরা হয়েছে চুয়েটের দীর্ঘ পথচলার ইতিহাস

চুয়েট সাংবাদিক সমিতির সভাপতি আসাদুল্লাহ আল গালিব জানালেন সেই ভাবনার কথা, যেখান থেকে তারা এমন একটি স্টলের পরিকল্পনা করেছিলেন। তিনি বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে আমরা চেষ্টা করেছি চুয়েটের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অর্জনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরতে। বিশেষ করে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে চুয়েট যেদিন পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল অর্থাৎ যেই ঐতিহাসিক দিনটিকে বিশ্ববিদ্যালয় দিবস হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে প্রতিবছর সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে আমরা আমাদের স্টলে তুলে ধরেছি। সেই সময়ের বিভিন্ন ঘটনা, আন্দোলনের স্মৃতি ও চুয়েটের পথচলার গল্প তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। এই জিনিসগুলো আমাদের স্টলকে অনন্য করে তুলেছে বলে মনে করি।"

বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের ভিড়ে তাই সাংবাদিক সমিতির ১৩ নম্বর স্টলটি ছিল অতীতের চুয়েট, বর্তমানের চুয়েট আর সময়ের সাক্ষী হয়ে থাকা কিছু গল্পের মেলবন্ধন। একটি ফ্রেম থেকে আরেকটি ফ্রেমে চোখ ঘোরালেই যেন বদলে যাচ্ছিল সময়-আর সেই পথ ধরেই বিআইটি থেকে আজকের চুয়েটের গল্পটি ফিরে ফিরে আসছিল নতুন প্রজন্মের সামনে।

২৪তম বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে ছবির ফ্রেম, পুরোনো সংবাদপত্র, প্রকাশনা আর স্মৃতির পাতায় এই সংগঠন তুলে ধরেছে অত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ পথচলা-যেখানে অতীত আর বর্তমানের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বলে হয়েছিল আগামীর গল্প।