ফাইয়াজ মুহাম্মদ কৌশিকঃ-
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলের পাশের পুকুরটি এখন পানিশূন্য। পুকুরের তলায় কাদামাটি, কোথাও কোথাও জমে আছে অল্প পানি। পাড়ও অনেকটা ফাঁকা। অথচ কয়েক সপ্তাহ আগেও এই পুকুর ছিল পানিতে ভরা। সেই পানিতেই ডুবে গত এক মাসে প্রাণ হারিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থী।
ঘটনার শুরু ২৮ জুলাই। যন্ত্রকৌশল বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী অর্নব সাহা পুকুরে নামার পর পানিতে তলিয়ে যান। দুই সপ্তাহের মাথায়, ১২ আগস্ট, একই পুকুরে ডুবে মারা যান তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের শান্ত দেব এবং কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল বিভাগের চমক দত্ত। তাঁরা দুজনই ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।
একই পুকুরে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যু হলেও প্রথম দুর্ঘটনার পর পুকুরে প্রবেশ ঠেকাতে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দ্বিতীয় দুর্ঘটনার পর পুকুরটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে সেখানে প্রবেশ ও সাঁতারে নিষেধাজ্ঞা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এর তিন দিনের মধ্যে সেচ দিয়ে পুকুরের পানি তুলে ফেলা হয়।
প্রশ্ন উঠেছে, প্রথম শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পরই কি পুকুরটি বন্ধ করা যেত না? সংস্কারের সময় পুকুরটির নকশায় নিরাপত্তার বিষয়টি কতটা গুরুত্ব পেয়েছিল? ঝুঁকি আগে থেকে চিহ্নিত করার সুযোগ কি ছিল না?
শিক্ষার্থীদের অনুরোধে শুরু হয়েছিল সংস্কার
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলীর তথ্য অনুযায়ী, কবি কাজী নজরুল ইসলাম হল-সংলগ্ন পুকুরটি বেশ পুরোনো। শিক্ষার্থীদের অনুরোধে পুকুরটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরকে (এলজিইডি)।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ‘সারাদেশে পুকুর ও খাল উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় ২০২৪ সালের অক্টোবরে পুকুরটির সংস্কারকাজ শুরু হয়। এ প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। কাজ পায় আনিম এন্টারপ্রাইজ।
চলতি বছরের এপ্রিলে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। পরে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করা হয়। তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর তদন্ত শুরু হওয়ায় বর্তমানে সংস্কারকাজ বন্ধ রয়েছে।
নকশায় যেখানে ছিল ঝুঁকি
পুকুরটির নকশা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এর ঢালের অনুপাত ১:২। অর্থাৎ উল্লম্বভাবে ১ ফুট নিচে নামার বিপরীতে অনুভূমিক দূরত্ব ২ ফুট। পাড় থেকে নেমে প্রথম সমতল অংশে পৌঁছাতে প্রায় ৮ ফুট নিচে নামতে হয়। এরপর আবার একই অনুপাতে ঢাল নেমে গেছে আরও প্রায় ৮ ফুট।
ঝুঁকিটা ছিল এখানেই। পাড়ের কাছাকাছি অংশেই পানির গভীরতা দ্রুত বেড়ে যায়। পুকুরে নামা কেউ ভারসাম্য হারালে অল্প দূরত্বেই গভীর পানিতে চলে যেতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জনসাধারণের ব্যবহারের পুকুরে তুলনামূলক মৃদু ঢাল রাখা নিরাপদ। ১:৩ বা ১:৪ ঢাল হলে গভীরতা ধীরে বাড়ে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে এবং উদ্ধারকাজও তুলনামূলক সহজ হয়।
এ ব্যাপারে চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আফতাবুর রহমান চুয়েটনিউজ২৪-কে বলেন,
'পুকুরের পার্শ্বের ঢাল ১:২-এর পরিবর্তে ১:৩ হলে পাড়ের কাছাকাছি নিরাপত্তা আরও ভালো পাওয়া যেত। পুকুরের আদর্শ প্রস্থচ্ছেদ বজায় রাখাও জরুরি। এতে ঢালের স্থায়িত্ব ও পুকুরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।'
তাঁর মতে,
'কাজের সময় সঠিক তদারকি এবং পরবর্তী সময়ে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।'
গভীরতা নিয়েও প্রশ্ন
পুকুরটির প্রকৃত গভীরতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী রনি দে-এর দাবি, পুকুরটির গভীরতা ৮ থেকে সাড়ে ৮ ফুট।
তবে সরেজমিনে দেখা যায়, সংস্কারের সময় পুকুর খনন করা হলেও উত্তোলন করা মাটি দিয়ে আবার পুকুরের তলদেশ ভরাট করা হয় নি। ফলে পুকুরের বিভিন্ন অংশে গভীরতা ১০ থেকে ১২ ফুট পর্যন্ত হয়েছে বলে দেখা যায়।
অর্থাৎ নকশায় উল্লেখ করা গভীরতার সঙ্গে বাস্তব অবস্থায় বেশ গড়মিল পাওয়া গেছে। পাড় থেকে অল্প দূরত্বেই গভীর পানিতে পৌঁছানোর সুযোগ থাকলেও পুকুরের আশপাশে গভীর বা ঝুঁকিপূর্ণ অংশ চিহ্নিত করে কোনো দৃশ্যমান নির্দেশনাও ছিল না।
নকশা অনুমোদন পেল কীভাবে
পুকুরটির নকশা সম্পর্কে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের প্রধান অধ্যাপক দেলোয়ার হোসাইন চুয়েটনিউজ২৪-কে বলেন,
‘পুরো প্রকল্প এলজিইডি দেখভাল করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মাঝেমধ্যে পরিদর্শন করেছে।’
অনুমোদনের ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সহযোগী অধ্যাপক তারেকুল আলম বলেন, প্রকল্প শুরুর সময় তিনি প্রকৌশল দপ্তরের দায়িত্বে ছিলেন না। তাঁর মতে,
‘তখন যিনি দায়িত্বে ছিলেন, তিনি হয়তো সবকিছু বুঝেই এই কাজের অনুমোদন দিয়েছেন।’
তবে রাউজান উপজেলা প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন,
‘নকশায় কোনো সমস্যা নেই। ১:২ ঢাল রাখায়ও সমস্যার কিছু নেই।’
অন্যদিকে চুয়েটের প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী রনি দে বলেন,
‘১:৩ বা ১:৪ ঢাল দিলে নির্মাণ ব্যয় বেশি হতো। বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করেই ১:২ ঢাল বেছে নেওয়া হয়েছে।’
প্রথম দুর্ঘটনার পরও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হলো না
প্রথম দুর্ঘটনার পরই কেন পুকুরটি বন্ধ করে দেওয়া হয়নি – এ প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের প্রধান অধ্যাপক দেলোয়ার হোসাইন বলেন,
'নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ছিল সংস্কারকাজ শেষ হওয়ার পর। কিন্তু কাজ শেষ হয়নি।'
তিনি বলেন,
'প্রথম দুর্ঘটনার পর নোটিশবোর্ড তৈরি করা হয়েছিল। সেটি পুকুরের পাশে স্থাপনের আগেই পরবর্তী দুটি দুর্ঘটনা ঘটে।'
এ বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী সহযোগী অধ্যাপক তারেকুল আলম বলেন,
‘পুকুর তো এভাবে বন্ধ করা যায় না। তবুও আমরা করেছি। প্রথম দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তবে এত দ্রুত আবার দুর্ঘটনা ঘটবে, তা কেউই ভাবেনি।'
সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চান শিক্ষার্থীরা
তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর এখন পুকুরটি পানিশূন্য। সহপাঠীদের হারিয়ে মুষড়ে পড়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাঁদের প্রশ্ন, নকশা প্রণয়ন থেকে শুরু করে সংস্কারকাজের তদারকি, ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং প্রথম দুর্ঘটনার পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কোথায় ঘাটতি ছিল?
বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আমিমুল ইহসান চুয়েটনিউজ২৪-কে বলেন,
‘পুকুরটি দেখলেই বোঝা যেত, এটি বেশ গভীর। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এমন একটি পুকুরের নকশা শিক্ষার্থীদের জন্য কতটা নিরাপদ ও কার্যকর, তা চুয়েট কর্তৃপক্ষের আগেই খতিয়ে দেখা উচিত ছিল।’
তিনি বলেন,
‘প্রথম শিক্ষার্থী মারা যাওয়ার পরও কেন তখনই প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হলো না—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অবশ্যই খুঁজে বের করা দরকার। পরে একই পুকুরে আরও দুজন শিক্ষার্থীর প্রাণহানি নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।’
আমিমুল ইহসানের আরও বলেন,
'তদন্তে কারও অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। ‘আর কোনো শিক্ষার্থীর প্রাণ যেন এমন অবহেলার কারণে না যায়’ - এটাই শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা।'