অনুরাশা রাফানাঃ-
ঘড়ির কাঁটা সাড়ে ১০টা ছুঁতেই বদলে যেতে থাকে চেনা ক্যাম্পাসের চিত্র। ক্লাসরুমের দরজা পেরিয়ে শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে আসতে থাকেন হাতে বিভাগের ব্যানার নিয়ে। কেউ ছুটছেন স্বাধীনতা চত্বরের দিকে, কেউ ব্যস্ত নিজেদের স্টল সাজাতে। চারপাশে রঙিন ব্যানার, পরিচিত মুখ আর উচ্ছ্বসিত পদচারণা দেখে মনে হচ্ছিল, প্রতিদিনের সেই চুয়েট যেন একদিনের জন্য পরিণত হয়েছে উৎসবের নগরীতে।
গত ৩১ আগস্ট থেকেই ক্লাব ফেস্টসহ নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের উদযাপন। পরদিন ১ সেপ্টেম্বর, ২৪ বছরে পা রাখার আনন্দে সেই আয়োজন ছড়িয়ে পড়ে পুরো ক্যাম্পাসে। আনন্দ র্যালি, পতাকা উত্তোলন, বৃক্ষরোপণ, নতুন বাসের উদ্বোধন, ক্লাব ফেস্ট আর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা-সব মিলিয়ে দিনটি হয়ে ওঠে স্মৃতি ও উদযাপনের একসঙ্গে চলা গল্প।
১৯৬৮ সালে চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হিসেবে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (বিআইটি), চট্টগ্রামে রূপান্তরিত হয়। পরে ২০০৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) নামে যাত্রা শুরু করে। সেই পথচলার ২৪তম বছরকে ঘিরেই ছিল এবারের আয়োজন।
যেভাবে শুরু
দুদিনব্যাপী আয়োজনের প্রথম দিন ক্যাম্পাসের বাস্কেটবল মাঠে শুরু হয় ক্লাব ফেস্ট। একই দিনে আয়োজন করা হয় জ্বালানিবিষয়ক বক্তৃতার। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ। বিষয়ভিত্তিক আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি টেকনোলজি পেট্রোনাসের (ইউটিপি) পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আজুয়ান বিন মাওনসার।
পরদিন ১ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের মূল আয়োজন ছিল আরও উৎসবমুখর। সেদিন ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন বিভাগ ও শাখার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ ব্যানার হাতে একে একে জড়ো হচ্ছেন স্বাধীনতা চত্বরে। রঙিন ব্যানার আর পরিচিত মুখের ভিড়ে ধীরে ধীরে জমে ওঠে উৎসবের আবহ। এরপর সেখান থেকেই বের হয় আনন্দ র্যালি। একসঙ্গে এগিয়ে চলা শিক্ষার্থীদের পদচারণায় প্রাণ ফিরে পায় চেনা ক্যাম্পাস।
জাতীয় সংগীতের সুরে উত্তোলিত হয় জাতীয় পতাকা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা। এরপর স্মৃতির অংশ হয়ে থাকে স্মারক বৃক্ষরোপণ। ভবিষ্যতের প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে স্থাপন করা হয় চট্টগ্রাম ওয়াসার পানি সংযোগ লাইনের ভিত্তিপ্রস্তরও।
এদিন আলহাজ্ব জসিম উদ্দিন ফাউন্ডেশনের উপহার দেওয়া ছয়টি বাসের উদ্বোধন করা হয়। ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন আনুষ্ঠানিকভাবে বাসগুলোর চাবি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেন। শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের এই নতুন সঙ্গীরা এখন যুক্ত হলো চুয়েটের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে।
স্টলে স্টলে অন্য এক চুয়েট
বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের দ্বিতীয় দিনেও চলছিল ক্লাব ফেস্টের আয়োজন। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন প্রান্তে সাজানো একেকটি স্টল যেন বহন করছিল একেকটি ভিন্ন জগতের পরিচয়। কোথাও ছিল শিক্ষার্থীদের তোলা ছবি, কোথাও রোবটিক্স ও প্রযুক্তিভিত্তিক প্রকল্প। কোনো স্টলে প্রদর্শিত হচ্ছিল ফর্মুলা কার্টের প্রকল্প, আবার কোথাও সংগীত, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার নানা আয়োজন।
শুধু দেখার আয়োজনেই থেমে থাকেনি ফেস্ট। দর্শনার্থীদের অংশগ্রহণের জন্যও ছিল নানা খেলা ও কার্যক্রম। পাজল, বাজ ওয়্যার, কুইজ, অফলাইন সাবওয়ে সার্ফার্সসহ বিভিন্ন খেলায় অংশ নিতে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের। কোথাও লেখা, কোথাও আঁকা, আবার কোথাও সংগীতের আয়োজন।
এর সঙ্গে ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতার আমেজও। স্টল সাজানো থেকে শুরু করে দর্শনার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা-সবকিছুতেই ছিল দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি ও আন্তরিকতার ছাপ। এক স্টল থেকে অন্য স্টলে ঘুরে বেড়ানো শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাসে ক্লাব ফেস্ট যেন হয়ে উঠেছিল বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের আরেকটি প্রাণবন্ত অধ্যায়। কেউ কেউ আবার এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে নিজেদের আগ্রহের নতুন জায়গাও খুঁজে পেয়েছেন।
ভবিষ্যতের কথা
দুপুরে কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে চুয়েটের ওপর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের পর অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এমপি। তিনি চুয়েটের দীর্ঘ পথচলা ও অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনকিউবেটরকে শিক্ষার্থীদের জন্য আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম-৬ আসনের সংসদ সদস্য গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী। বিশেষ বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি টেকনোলজি পেট্রোনাসের (ইউটিপি) পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান আইআর. ড. মোহাম্মদ আজুয়ান বিন মাওনসার। তিনি চুয়েটের অগ্রযাত্রার প্রশংসা করে শিক্ষা ও গবেষণায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সম্ভাবনার কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং উন্নয়ন এবং বিশ্বমানের শিক্ষা ও গবেষণা নিশ্চিত করার প্রত্যয়ের কথা তুলে ধরেন।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন,
“সারাবিশ্বে অনেক ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে। এ পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ-খাওয়াতে হবে। নয়তো বিশ্ব আমাদের অনেক আগে চলে যাবে, আমরা পেছনে পড়ে থাকব।”
তিনি আরও বলেন,
“আমাদের ছেলেমেয়েদের অনেক মেধা আছে। আমাদের অনেক ভালো গবেষকও আছেন। সরকার গবেষণার ওপর এবার অধিকতর গুরুত্ব দিয়েছে। এখন উদ্ভাবন নিয়ে আমাদের আরও বেশি চিন্তা করতে হবে। বর্তমান সরকার উদ্ভাবন নিয়ে অনেক কাজ শুরু করেছে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উদ্ভাবনীমূলক কাজ অনেক পছন্দ করেন। আমাদের উদ্ভাবনী শক্তি যাদের আছে, তাদের খুঁজে বের করতে হবে। আমি মনে করি চট্টগ্রাম হবে বাংলাদেশের লজিস্টিক হাব। এখানে চুয়েটও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। চুয়েটের সক্ষমতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাক-এই কামনা করি।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন,
“আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা দেশ থেকে পড়াশোনা শেষ করে সিলিকন ভ্যালিতে চাকরি করছেন। তাঁদের মেধা ও দক্ষতাকে দেশের কাজেও লাগাতে হবে। এ জন্য আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও আলোকিত করতে হবে।”
দিনের শেষে
আনুষ্ঠানিক আলোচনা ও বক্তব্যের বাইরেও সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় মুখর হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। গানের সুর, পরিবেশনা আর শিক্ষার্থীদের প্রাণচাঞ্চল্যে উৎসবের আবহ যেন আরও পূর্ণতা পায়।
তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আতিকুর রহমান বলেন,
"প্রতি বছরই বিভিন্নভাবে চুয়েটে বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উদযাপন করা হয়। তবে এবারের আয়োজনটি আমার মতো অনেকের কাছেই ছিল একেবারেই নতুন এক অভিজ্ঞতা। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় ছিল, এবারই প্রথমবারের মতো চুয়েটে ক্লাব ফেস্টের আয়োজন করা হয়। এর পাশাপাশি বিভিন্ন একাডেমিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও ছিল আয়োজনের অংশ।দীর্ঘদিনের পড়াশোনা ও একাডেমিক ব্যস্ততার মাঝে এই আয়োজন যেন সবার জন্য একটু ভিন্নভাবে নিজেদের সময় দেওয়া, আনন্দ করা এবং নতুন করে সতেজ হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছিল। পুরো আয়োজনজুড়েই ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ, যেখানে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার গণ্ডির বাইরে এসে নিজেদের আগ্রহ, প্রতিভা ও সৃজনশীলতাকে উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছেন।"
২৪ বছরের পথ পেরিয়ে চুয়েট এখন দাঁড়িয়ে নতুন দিনের দোরগোড়ায়। পেছনে জমেছে অর্জন ও স্মৃতি, সামনে অপেক্ষা করছে আরও অনেক গল্প। আর সেই গল্প লেখার অপেক্ষায় চুয়েটের চেনা ক্যাম্পাস আবার ফিরে গেছে তার প্রতিদিনের ছন্দে।