চুয়েটনিউজ২৪ ডেস্কঃ-
মাত্র কয়েকদিন আগে সহপাঠীদের করতালির মধ্যে নতুন দায়িত্ব পেয়েছিলেন। আমেরিকান সোসাইটি অব হিটিং, রেফ্রিজারেটিং অ্যান্ড এয়ার-কন্ডিশনিং ইঞ্জিনিয়ার্স (আশরেই) চুয়েট স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সংগঠনকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথচলা শুরু হওয়ার আগেই থেমে গেল সব। ক্যাম্পাসের কবি কাজী নজরুল ইসলাম হল-সংলগ্ন পুকুরে ডুবে অকালেই চলে গেলেন যন্ত্রকৌশল বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী অর্নব সাহা।
গত ২৩ জুলাই(বৃহস্পতিবার) চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) ইএমই ভবনে আশরেই চুয়েটের নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে সভাপতি নির্বাচিত হন মো. আমিমুল ইহসান এবং সাধারণ সম্পাদক হন অর্নব সাহা। ২৬ সদস্য বিশিষ্ট এই কমিটিতে আরও ছিলেন কোষাধ্যক্ষ নাহিদ হাসান, সাংগঠনিক সম্পাদক অরুণাভ ভট্টাচার্য, দপ্তর সম্পাদক ফারদিন হোসেন অন্তর সহ অনেকে।
নতুন দায়িত্ব নিয়ে সংগঠনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন অর্নব। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের কয়েকদিনের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু শুধু আশরেই পরিবার নয়, পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কেই শোকাহত করে।
‘অর্নব ছিল আমাদের সবচেয়ে দায়িত্বশীল সদস্যদের একজন’
অর্নবকে স্মরণ করতে গিয়ে অ্যাশরেই চুয়েটের নবনির্বাচিত সভাপতি মো. আমিমুল ইহসানের কণ্ঠে ফুটে ওঠে গভীর বেদনা। চুয়েটনিউজ২৪কে তিনি বলেন, “অর্নব শুধু একজন বন্ধু ছিল না; সে ছিল আমাদের সবচেয়ে পরিশ্রমী, দায়িত্বশীল ও আন্তরিক সদস্যদের একজন। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ক্লাবকে আরও এগিয়ে নেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন কিছু করার নানা পরিকল্পনা করছিল সে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সেই স্বপ্নগুলো পূরণের সুযোগ আর পেল না।”
তিনি আরও বলেন,” অ্যাশরেইর প্রতিটি টেকনিক্যাল ইভেন্ট, প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও বিভিন্ন কার্যক্রমের পেছনে অর্নবের ছিল গুরুত্বপূর্ণ অবদান। অনেক কাজই সে নীরবে, সবার আড়ালে থেকে করে গেছে। তাঁর নেতৃত্ব ও দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ASHRAE Undergraduate Equipment Grant Program-এ চুয়েটের একটি প্রস্তাবনা নির্বাচিত হয় এবং সংগঠনটি অর্জন করে ২,০৫০ মার্কিন ডলারের আন্তর্জাতিক অনুদান”।
আমিমুল মনে করেন, এটি শুধু গবেষণার অনুদান ছিল না। বরং এটি ছিল অর্নবের নিষ্ঠা, শ্রম ও নেতৃত্বের স্বীকৃতি।
“পরিকল্পনা ছিল অর্নবদের নিয়ে কাজ করার, কিন্তু তা আর হলো না”
অর্নবের কথা বলতে গিয়ে থমকে যান অ্যাশরেই চুয়েটের প্রধান উপদেষ্টা ও যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক জামাল উদ্দীন আহাম্মদ। তিনি বলেন, “গবেষণার কাজে একটি এয়ার কন্ডিশনার এনে রেখেছিলাম। পরিকল্পনা ছিল, শিক্ষার্থীদের নিয়ে সেটি খুলে দেখাব। অর্নবও সেই দলের অংশ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই সুযোগ আর হয়ে উঠল না।”
দুর্ঘটনার রাতের স্মৃতি এখনও তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। তিনি বলেন,” অর্নবের খবর পাওয়ার পরপরই হাসপাতালে যোগাযোগ করা হয়. চিকিৎসকদের প্রস্তুত থাকার জন্য বলি। সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
জামাল উদ্দীন আহাম্মদ আরও বলেন, “তাঁর বাবাকে ফোন করেছিলাম। তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত। ছেলের মৃত্যুর খবর কীভাবে জানাব, সেটিই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। একজন শিক্ষকের জীবনে এর চেয়ে কঠিন মুহূর্ত খুব কমই আসে।”
“শেষ ফোনকলের স্মৃতি”
চুয়েট সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফাইয়াজ মুহাম্মদ কৌশিক বলেন, “অর্নবের সঙ্গে দুদিন আগেও অ্যাশরেইর বার্ষিক সাধারণ সভার সংবাদ প্রকাশের বিষয়ে কথা হয়েছিল। এমনকি দুর্ঘটনার ঠিক কিছুক্ষণ আগেও, রাত ৭টা ১২ মিনিটে, সংবাদসংক্রান্ত তথ্য নেওয়ার জন্য আমাদের কালেরকন্ঠ প্রতিনিধি নাজমুল কবির সিয়ামের সঙ্গে তার ফোনে কথা হয়। অথচ এর মাত্র আধা ঘণ্টা পরই জানতে পারি, সে আর নেই।”
তিনি বলেন, “সম্ভবত আমাদের সঙ্গে হওয়া সেটিই ছিল অর্নবের জীবনের শেষ ফোনকলগুলোর একটি। অথবা সেটাই ছিল ওর শেষ ফোনকল। একজন মেধাবী ও সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীকে এভাবে হারিয়ে ফেলা আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এই শোক মেনে নেওয়া কঠিন। তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানোর ভাষাও আমাদের নেই। শুধু প্রার্থনা করি, অর্ণবের আত্মা শান্তিতে থাকুক।”