ফাইয়াজ মুহাম্মদ কৌশিকঃ
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের(চুয়েট) প্রধান ফটকে পা রাখতেই চোখে পড়ে শহিদ মিনার। বাম পাশে সোজা পথ ধরে এগোলে পাওয়া যায় বিস্তীর্ণ এক পুকুর। আর ঠিক তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে একটি ছাত্রাবাস, যার দেয়ালে আঁকা ইতিহাস, কীর্তিমান মানুষের মুখচ্ছবি। এর মূল ফটকের সামনে রয়েছে মোহাম্মদ শাহ নামে এক তরুণের ম্যুরাল। তিনিই শহিদ মোহাম্মদ শাহ—মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ উৎসর্গ করা চুয়েটের এক তরুণ ছাত্র। তাঁর নামেই ছাত্রাবাসটির নাম করা হয়েছে ‘শহীদ মোহাম্মদ শাহ হল’। এ হলের পেছনেই রয়েছে আরেক শহিদের স্মৃতি—‘শহীদ তারেক হুদা হল’। আরও সামনে এগোলেই ড. কুদরত-ই-খুদা হলের পাশে শায়িত মুক্তিযুদ্ধের তিন শহিদ—অধ্যাপক দিলীপ কান্তি চৌধুরী, মোজাফফর আহমদ এবং মো. ইউনুছ। চুয়েটের বুকেই জায়গা করে নিয়েছে তাদের কবর।
“প্রকৌশল শিক্ষার্থী থেকে মুক্তিযোদ্ধা: দিঘীর পাড়ে শহীদ হওয়া শাহ ভাইদের গল্প”-
এই পাঁচজন শহিদের মধ্যে চুয়েটের ছাত্র ও স্থানীয় হওয়ায় সবথেকে বেশি জানা যায় মোহাম্মদ শাহ সম্বন্ধে। তাঁর জন্ম ১৯৫১ সালের ২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার মরিয়ম নগরে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পুরকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর রাঙ্গুনিয়ার বিভিন্ন এলাকায় শক্ত ঘাঁটি হিসেবে গড়ে তোলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। তরুণ মোহাম্মদ শাহ মেনে নিতে পারেন নি সেই দখলদার বাহিনীকে। দেশমাতৃকার টানে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তিনি। তার সঙ্গী ছিলেন তাঁরই আপন ভাই আহম্মদ শাহ। তাঁরা গোপনে সংগঠিত হয়ে বিভিন্ন অপারেশন পরিচালনা করতেন। দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল। দুজনকেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ধরে ফেলে। পরের দিন সকাল আনুমানিক সাতটার দিকে শহীদ মোহাম্মদ শাহ এবং তাঁর ভাইকে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া কলেজের দক্ষিণে মাজারের পাশের দিঘীর পাড়ে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে।
তাঁর মৃত্যুর ঘটনা সম্পর্কে চুয়েটনিউজ২৪কে জানান তাদের ছোটভাই আকবর শাহ। ভাইয়ের স্মৃতি আজও হাতরে বেড়ান তিনি, সুযোগ পেলেই কবর জিয়ারত করেন। চুয়েটনিউজ২৪কে তিনি বলেন, “পাক-আর্মিরা আমাদের বাসায় এসে লুটপাট করছিল। বাড়িতে মা-বোন ছিল। ওদেরকেও অত্যাচার করতে পারে এ ধরনের খবর শুনে ভাইয়েরা ছুটে আসেন। পরবর্তীতে তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। পরদিন যখন লাশ নিয়ে এসে উঠোনে রাখা হয়, মা কোরআন শরীফ পড়ছিলেন। আমি তখন ছোট ছিলাম, নিজে ভাইয়ের মাথার ক্ষত-বিক্ষত খুলি ধরে দেখেছি”।
তবে, আকবর শাহ মনে করেন শহিদ হিসেবে তার ভাইদের যথাযথ মুল্যায়ন করা হয় নি। তিনি জানান,” শহীদ হিসেবে ভাইদের কোনো সনদ নেই। অনেক শহীদদের পরিবার অনেক কিছু পাচ্ছে, আমাদের তা দরকার নেই। আমরা শুধু একটা নাম চাচ্ছিলাম। সেটাও আমরা পাচ্ছি না। আগে ভাইয়ের নামে একটা ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্ট হত। সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকেই বলেছিল অনেক কিছু করবে, কিন্তু কিছুই হয় নি”।
“হারিয়ে যাওয়া বীর তারেক হুদা, মৃত্যুর ইতিহাস যার অনুলিখিত”-
শহীদ তারেক হুদা হলের ম্যুরালে লেখা তথ্য হতে জানা যায়, তাঁর জন্ম ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি বরিশালের কাউখালী থানার পারসাটুরিয়া গ্রামে। বাবার নাম মোহাম্মদ শামসুল হুদা। তারেক হুদা ১৯৬৬ সালে এসএসসি এবং ১৯৬৮ সালে এইচএসসি পাস করে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হন। তিনি ছিলেন খুব মেধাবী, চটপটে এবং শিল্পমানসিকতা সম্পন্ন। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিনি ছিলেন যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী। চুয়েটের অ্যাথলেটিক্স ক্লাবের লোগো তাঁরই করা। কিন্তু প্রকৌশল জীবনের প্রথম ধাপটি পার না হতেই দেশব্যাপী বেজে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের ধামামা। সেই যুদ্ধে শহীদ হন তারেক হুদা।
তবে তারেক হুদা কোথায়, কীভাবে, কখন, মারা যান, সেই তথ্য স্পষ্টভাবে তেমন কেউ জানেন না। বিভিন্ন সূত্রে তারেক হুদার শহীদ হওয়া সম্পর্কে দুইটি মত আছে। এরমধ্যে একটি হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাকে কলেজ ক্যাম্পাস থেকে পাকিস্তানী বাহিনী ধরে নিয়ে যায়। যুদ্ধ শেষে আর তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। তারপর তারা তাকে হত্যা করেছিল। আবার কারো কারো মতে, তিনি নিজেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে কলেজ ছেড়ে যান। পরবর্তীতে যুদ্ধক্ষেত্রেই শহীদ হন। এ ব্যাপারে শহীদ তারেক হুদা হলের সাবেক প্রভোস্ট অধ্যাপক ফারুকুজ্জামান চৌধুরী চুয়েটনিউজ২৪কে বলেন, “২০০৩ সালের দিকে প্রভোস্ট থাকাকালীন সময়ে এ ব্যাপারে জানার জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু তিনি কিভাবে শহিদ হয়েছিলেন এ ব্যাপারে স্পষ্টভাবে জানা যায় নি। তার বোনের সঙ্গেও আমরা যোগাযোগ করেছিলাম। তিনিও বলতে পারেন নি।”
“মুক্তিযুদ্ধে চুয়েটেই হয়েছিল যেই ৩ শহিদের শেষ ঠিকানা”-
চুয়েটের দুই শিক্ষার্থীর গৌরবগাঁথার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের তিনজন শহিদের কবর চুয়েটে রয়েছে। তবে তাঁরা চুয়েটের কোনো শিক্ষক, শিক্ষার্থী কিংবা কর্মচারী নন। এই তিনজন হলেন অধ্যাপক দিলীপ কান্তি চৌধুরী, মোজাফফর আহমদ এবং মো. ইউনুছ। এই তিন ব্যক্তিও কিভাবে মারা যায় তার সঠিক তথ্য পুরোপুরি জানা সম্ভব হয় নি। তবে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, পাক হানাদার বাহিনী চুয়েট সংলগ্ন ইমাম গাজ্জালী কলেজের সামনে থেকে তাদেরকে ধরে এনে ক্যাম্পাসে নির্যাতন করে হত্যা করেছে। পাক আর্মি ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যাবার পর ক্যাম্পাসে থাকা শিক্ষক কর্মচারীরা এই তিন জনের মৃতদেহ হোস্টেলের সামনে পেয়ে কবরস্থ করার ব্যবস্থা করেছিলেন।
“আগাছায় ঢাকা কবরে হারিয়ে যাচ্ছে স্মৃতি, কি বলছে প্রশাসন”-
ক্যাম্পাসের সঙ্গে এ পাঁচ শহিদের নাম জড়িয়ে থাকলেও তাদের ব্যাপারে ক্যাম্পাসের বেশিরভাগ সাধারণ শিক্ষার্থী তেমন কিছুই জানেন না। ক্যাম্পাসে তাদের নিয়ে তেমন চর্চাও হয় না। ড. কুদরত-ই-খুদা হলের কাছে অবস্থিত তিন শহিদের কবরও পড়ে আছে অযত্নে, অবহেলায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, তাদের কবরে জমে আছে আগাছা। নামফলকে শহিদদের নাম লেখা থাকলেও তাতে নেই লেখা কোনো ইতিহাস। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শহিদদের ব্যাপারে কোনো চর্চাও হয় না। এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তুষার আহমেদ চুয়েটনিউজ২৪কে বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এদেশের জন্ম হয়েছে। লাখো শহিদের রক্তের বিনিময়ে আমরা এই লাল-সবুজ পতাকা পেয়েছি। আমাদের ক্যাম্পাসের দুই ভাই শহিদ হয়েছেন। আরও তিন জনের কবর চুয়েটে রয়েছে- তারাও আমাদের ভাই। তাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা আজ এই স্বাধীন দেশে নিঃশ্বাস নিচ্ছি। অথচ তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে দেখা যায় অবহেলা। প্রশাসনের উচিত মাঝেমধ্যে স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠান আয়োজন, সাময়িকী প্রকাশ ইত্যাদি বিভিন্ন উপায়ে তাদের স্মৃতি, তাদের ত্যাগ সবার সামনে তুলে ধরা। তবেই হয়ত আমরা তাদের ঋণ কিছুটা হলেও শোধ করতে পারব”
এ ব্যাপারে চুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড.মাহমুদ আব্দুল মতিন ভুইয়ার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি চুয়েটনিউজ২৪কে বলেন,’ বীর শহীদরা আমাদের চুয়েটেরই গর্ব। তাঁদের আত্মত্যাগকে চুয়েট পরিবার চিরদিন কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছে, করে যাবে। আমরা চাই, নতুনরা আরো বেশি হারে এই দুই বীর ছাত্রের অবদান জানুক। দুই বীর ছাত্রের নামে আমাদের দুটি হলের নামকরণ করা হয়েছে। দুটি হলের সম্মুখে তাঁদের বড় প্রতিকৃতিসহ নাম লেখা আছে। হল প্রশাসন বিভিন্নভাবে তাঁদের অবদানকে উপস্থাপন করে। এছাড়া বিভিন্ন জাতীয় দিবসে, দাপ্তরিক প্রকাশনায় দুইজন ছাত্রকে আমরা স্মরণ করে তুলে ধরি।
আমাদের ক্যাম্পাসে তিনজন শহীদের কবর আছে, যাঁদের প্রতিও আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থাকে সবসময়। ইতিমধ্যে সুন্দরভাবে তিনটি কবরকে দৃষ্টিনন্দন করে সংরক্ষণ করা হয়েছে। সেখানে তাদের নামফলকও স্থাপন করা হয়েছে। অত্র প্রতিষ্ঠানের ৩২ ব্যাচের সৌজন্যে এই কাজটি করা হয়। জাতীয় দিবসসহ বিভিন্ন উপলক্ষে চুয়েট পরিবারের পক্ষ থেকে এই বীর শহীদদের কবর জেয়ারত ও মোনাজাত করা হয়। সময়ে সময়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হয়। এরপরও শহীদ দুই বীর ছাত্র এবং কবরস্থ তিন শহীদকে নিয়ে আমাদের আরো করণীয় থাকতে পারে। এসব বিষয়ে সকলের মতামত সাপেক্ষে আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে সচেষ্ট আছি। ‘