মো.ফাহিম রেজা :
২০১৮ সালে চাঁদার দাবিতে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) দুই শিক্ষার্থীকে বর্বর কায়দায় নির্যাতনের ঘটনায় নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের তৎকালীন ৬ নেতার বিরুদ্ধে মামলা করেছিল ভুক্তভোগীরা।উক্ত মামলায় তৎকালীন চুয়েট ছাত্রলীগের তিন নেতার বিরুদ্ধে জারি হয়েছে গ্রেফতারি পরোয়ানা।
তারা হলেন তৎকালীন চুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সৈয়দ ইমাম বাকের, সাধারন সম্পাদক মো. শাখাওয়াত হোসেন (প্রকাশ সম্রাট), সাংগঠনিক সম্পাদক অতনু মুখার্জী।
দুটি পৃথক মামলায় উক্ত তিনজন সহ তৎকালীন ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নিলয় দে, সহ-সভাপতি মেহেদী হাসান ফরহাদ ও ফখরুল ইসলাম ফাহাদসহ আরো অজ্ঞাত ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছিলো ।
উক্ত মামলায় চট্টগ্রামের রাউজান থানায় তদন্তের পর গতকাল মামলার চার্জশিট প্রকাশ করেছে আদালত। এতে তিনজনের বিরুদ্ধে কয়েকটি ধারায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত।
জানা যায়, গত মার্চ মাসে চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফারজানা ইয়াছমিনের আদালতে ভুক্তভোগী চুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী জামিল আহসান এবং মাহমুদুল ইসলাম বাদী হয়ে পৃথক দুটি মামলা করেন। জামিল ও মাহমুদুল উভয়েই চুয়েটের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।
মাহমুদুল ইসলাম তার অভিযোগপত্রে লিখেছেন, ২০১৮ সালের ১৪ মে অভিযুক্ত বাকের ও সম্রাট তাকে শিবিরের নেতা আখ্যা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হলে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা দিতে অসম্মতি জানালে ১৯ মে রাত ১টায় অভিযুক্তরাসহ ১০ থেকে ১৫ জন আবাসিক হলে তাঁর রুমে গিয়ে ভাঙচুর করে সকল শিক্ষা সনদ এবং ১৫ হাজার টাকার জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়।
সনদগুলো ফেরত পেতে তিনি তাদের সাথে কথা বলতে উপস্থিত হলে চুয়েট ছাত্রলীগের অভিযুক্ত সেই নেতাকর্মীরা তাকে বেধড়ক মরধর করে। একপর্যায়ে অভিযুক্তরা বাদীর বাবাকে ফোন করে বাদীর কান্না শুনিয়ে তাঁর কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। সেই সময় জীবন বাঁচাতে এক সপ্তাহের সময় চেয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসলেও পরে টাকা দিতে না পারায় ভয়ে মাহমুদুল ইসলাম আর কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে যাননি। এতে তার ছাত্রজীবন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কিন্তু আওয়ামী লীগের শাসন থাকায় গত ৭ বছর কোনো আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেননি বলেও অভিযোগপত্রে দাবি করেছেন তিনি।
আরেক মামলার অভিযোগপত্রে বাদী জামিল আহসান দাবি করেন, একই পদ্ধতিতে তার কাছেও ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিল অভিযুক্ত বাকের ও সম্রাট। কিন্তু এত টাকা জোগাড় করা তার পক্ষে সম্ভব না হওয়ায় পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন তিনি। এক পর্যায়ে ২০১৮ সালের ১৯ জুলাই পরীক্ষায় অংশ নিতে ক্যাম্পাসে গেলে পরীক্ষা শেষ করা মাত্র তাকে তুলে নিয়ে ছাত্র সংসদে আটকে রেখে লোহার রড, হকিস্টিক, স্ট্যাম্প দিয়ে তাঁর ওপর শারীরিক নির্যাতন চালান অভিযুক্তরা। মারধরে এক পর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেললে পানি দিয়ে জ্ঞান ফিরিয়ে আবারও মারধর করে তাঁরা। তারপর বাদীর সামনে ছুরি রেখে ছবি তুলে মিথ্যা মামলা দিয়ে তাকে রাউজান থানায় সোপর্দ করে ছাত্রলীগের অভিযুক্ত নেতারা। ওই মামলায় তিন মাস কারাভোগ করতে হয় তাকে। এই হয়রানির কারণে তারও শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে মামলায় তিনি দাবি করেন।
এই ভুক্তভোগীদের পক্ষের আইনজিবি ইমরানুল হক বলেন, আসামীরা যে অপরাধগুলো করেছে ক্লাস করতে দেয়নি, পরীক্ষা অংশগ্রহণ করতে দেয়নি, তাদের কাছে অবৈধভাবে চাঁদা চাওয়া এবং সে টাকা দিতে অপরগত প্রকাশ করায় শারীরিক নির্যাতন এই কাজগুলো অবশ্যই অপরাধযোগ্য কাজ।রাউজান থানায় যথাযথ তদন্তের পর এই আদেশ দিয়েছে আদালত। অপরাধীরা অপরাধের পরও চাকরি জীবনে বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছে গেছে কিন্তু যারা এই অপরাধে ভুক্তভোগী ছিল তাদের শিক্ষাজীবন দীর্ঘায়িত হয়েছে দীর্ঘদিন তারা বঞ্চিত ছিল। বিজ্ঞ আদালতে যে রায় দিয়েছে আশা করছি তা দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন হবে এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায় বিচার নিশ্চিত হবে।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর মাহমুদুল ইসলাস বলেন, আমাদের এই আইনী লড়াই আমাদের ইনসাফের লড়াই। আমাদের সাথে হওয়া অন্যায় এর যথাযথ বিচার হয়নি। আমরা এই ইনসাফের লড়াইয়ে আমাদের শিক্ষকদের যথাযথ সহযোগিতা পাইনি। আমার জীবন থেকে গুলো বছর হারিয়ে গেছে। একটা লম্বা সময় আমাকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রবেশ করতে দেয়নি। যাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে তাদেরকে অতি দ্রুত গ্রেপ্তার করার দাবি জানাচ্ছি। পাশাপাশি শিক্ষকরা যেন যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীদের পাশে থাকে তাদেরকে যথাযথ নিরাপত্তা দেয় সেই দাবি জানাচ্ছি।