যুক্তির যুদ্ধে, উৎসবের-উচ্ছ্বাসে চুয়েটে ৯ম তারুণ্য উৎসব

জারীন তাসমীন সাবা

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে(চুয়েট) চলছে যুদ্ধ। আর এ যুদ্ধে নেমেছে দুই প্রতিপক্ষ। একে অন্যকে ঘায়েল করার তীব্র প্রচেষ্টা। কিন্তু এ যুদ্ধ কোনো সমরাস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে না। বরং এখানে মূল অস্ত্র হলো বাকশক্তি। আর যুক্তি হলো তার ঢাল। গতকাল চুয়েট ডিবেটিং সোসাইটির আয়োজিত ৯ম তারুণ্য উৎসবে গিয়ে দেখা যায় এ বিতর্কের মহারণ।

তিনদিন ব্যাপী এ আয়োজনে চুয়েট ক্যাম্পাসে দেখা মেলে জমকালো সাজ। ব্যানার-ফেস্টুনে ক্যাম্পাস সেজেছে নতুন রুপে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর কনসার্ট এ উৎসবকে দিয়েছে পূর্ণতা। সারাদেশ থেকে আগত বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে চুয়েট যেন পরিণত হয়েছিল ছোটখাটো এক উৎসবের নগরীতে!

তিনদিন ব্যাপী অনুষ্ঠিত এই আয়োজনের সূচনা হয় বই বিনিময়ের মাধ্যমে। এক ভিন্ন অবগাহনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক মিলনায়তনের( টিএসসি) ক্যাফেটেরিয়ায় ৩১ জুলাই (বৃহস্পতিবার) শুরু হয় বই বিনিময় উৎসব । শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরনের বই নিয়ে আসেন। বিনিময় করেন সেখানে একে অন্যের সাথে। সেখান থেকেই উৎসবের শুরু।

এরপর দ্বিতীয় দিন, পহেলা আগস্ট (শুক্রবার) সকাল থেকে শুরু হয় আন্তঃস্কুল, আন্তঃকলেজ ও আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক প্রতিযোগিতা। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মোট ৫২টি দল এ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক থেকে অর্থনৈতিক , কাল্পনিক থেকে মহাজাগতিক সকল বিষয়েই চলে দিনভর যুক্তির লড়াই। সকাল ৯টায় শুরু হয়ে এ প্রতিযোগিতা চলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। যুক্তির এই লড়াই চলে চারটি ধাপে। প্রতিটি ধাপ শুরুর ১৫ মিনিট আগে প্রতিযোগীদের বিতর্কের বিষয় সম্পর্কে জানিয়ে দেওয়া হয়। এরপর চটপট যুক্তি সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন বিতার্কিকেরা। পরে তাঁদের মধ্য থেকে বাছাই করা ৮টি দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় কোয়ার্টার ফাইনাল। ট্যাব ফরম্যাটে পরিচালিত এই বিতর্কের শেষ হয় চূড়ান্ত ৪ দল নির্বাচনের মাধ্যমে। এরপরই যুক্তিতে ক্লান্ত মনকে শান্ত করতে অনুষ্ঠিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা ও কনসার্ট। এই কনসার্টে মঞ্চ মাতায় জনপ্রিয় গানের দল ‘সহজিয়া’ ও ‘লেভেল ফাইভ’।

২য় দিনের বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে এসেছিলেন প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস। আলাপকালে তিনি জানান, এ রকম প্রতিযোগিতায় সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিতর্ক করার ফলে জ্ঞানের পরিধি সমৃদ্ধ হয়। পাশাপাশি অনেকের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শাহানেওয়াজ রশিদ দীপ্ত বলেন , চুয়েট ও বাইরের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনেকে অংশগ্রহণ করেছে, তাদের সঙ্গে পরিচিত হতে পেরে ভালো লেগেছে । সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছে ।

চুয়েট ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি গোলাম মুরাদ বলেন, বিতর্কের মাধ্যমে নানা বিষয়ে জানার সুযোগ সৃষ্টি হয়। বিতর্ক আমাদের চিন্তা, চেতনা ও মেধা বিকশিত করে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতার্কিকদের অংশগ্রহণের ফলে নতুন সম্পর্ক গড়ে ওঠে। শিক্ষার্থীদের এ সুযোগ তৈরি করে দিতেই নবমবারের মতো এই বিতর্ক উৎসব বা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয় ঢাকা ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটি এবং রানার্স আপ হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিবেটার্স অফ চিটাগং ইউনিভার্সিটি । স্কুল- কলেজ পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয় সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ এবং রানার্সআপ হয় ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

তাছাড়া স্কুল-কলেজ পর্যায়ে ডিবেটার অব দ্যা টুর্নামেন্ট হয় সরকারি মুসলিম হাই স্কুলের সাদমান সারার এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ডিবেটার অব দ্যা টুর্নামেন্ট হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রহমত উল্লাহ ।স্কুল-কলেজ পর্যায়ে ডিবেটার অব দ্যা ফাইনাল হয় সরকারি হাজী মোহাম্মদ মহসিন কলেজের অরিজিত ধর এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ডিবেটার অব দ্যা ফাইনাল হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রহমত উল্লাহ।

শেষ দিনে, ২রা আগস্ট, চুয়েট অডিটোরিয়ামে “সওদা” এবং “নিলীন” দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। এরপরই অনুষ্ঠিত হয় বিতর্ক প্রতিযোগিতার প্রাক-চূড়ান্ত ও চূড়ান্ত পর্ব। চূড়ান্ত পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তুমুল যুদ্ধে বিজয়ী হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির দল। বিতর্ক ছাড়াও সারাদিনব্যাপী চলে আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনী। পাশাপাশি একইদিনে উন্মোচিত হয় চুয়েট ডিবেটিং সোসাইটির বার্ষিক ম্যাগাজিন ‘মিছিল’। পরিশেষে, পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে  ইতি ঘটে তিনদিন ব্যাপী জমকালো এ উৎসবের।