
ফাইয়াজ মুহাম্মদ কৌশিকঃ
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)-এর ছাত্র ও ছাত্রীদের আবাসিক হলের ডাইনিং সেবায় দৃশ্যমান পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, যেখানে ছেলেদের হলে প্রতিদিনের খাবারে দুবেলা মাছ ও মাংস নিয়মিত পরিবেশন করা হয়, সেখানে ছাত্রীদের হলে সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের দাবি, দুপুরে মাছ বা মাংস থাকলেও, রাতের ডাইনিংয়ে দিনের পর দিন চলছে শুধুমাত্র সবজি, ভর্তা বা ডিম। এসময় মাছ কিংবা মাংসের দেখা পাওয়া যায় কালেভদ্রে।
প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে সারাদিন ক্লাস-ল্যাব নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয় শিক্ষার্থীদের। তন্মধ্যে কুইজ,ভাইভা আর টার্ম ফাইনাল নিয়ে আসে বাড়তি চাপ। টিউশন কিংবা চাকরির প্রস্তুতি তো আছেই। এসব মোকাবিলায় শরীরের জন্য দরকার সঠিক পুষ্টি গুণাগুণ সম্পন্ন সুষম খাবার। কিন্তু চুয়েটে মেয়েদের হলগুলোতে খাবারের পুষ্টিগুণের এ চাহিদা আদৌ মেটানো সম্ভব হচ্ছে কিনা সে প্রশ্ন থেকেই যায়। ডাইনিংয়ের খাবার নিয়ে রয়েছে তাদের নানা অভিযোগ।
এ ব্যাপারে তাপসী রাবেয়া হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আতিয়া জয়নাবা লিরা চুয়েটনিউজ২৪ কে জানান, সমপরিমাণ ডাইনিং ফী দেওয়া সত্ত্বেও ‘মীনাকে অর্ধেক ডিম, আর রাজুকে ফুল ডিম’ দেওয়ার মতো পরিস্থিতির শিকার হচ্ছি আমরা। ছেলেদের হলে মাছ/মুরগী ইচ্ছামতো বাছাইয়ের সুযোগ দেওয়া হলেও আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে ভর্তা/সবজি/ডিমভাজা দিয়ে। এ কারণে রাতের খাবার বেশিরভাগ দিনই খাওয়া হচ্ছে না। আবার মাসিক ফিস্টে ছেলেদের হলে যেখানে গরু/খাসি থাকে সেখানে আমাদের ব্রয়লার মুরগীতেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয়। এই বৈষম্য ঠিক কি কারণে হচ্ছে তা জানতে চাইলেও নানান অজুহাত। আমি চাই খুব দ্রুতই এই অবস্থার পরিবর্তন হোক।
শামসেন নাহার খান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী তাহরিমা রাহা বলেন, বর্তমানে হলের ডাইনিংয়ের খাবারের মান ও পরিমাণ—উভয়ই চরম অব্যবস্থাপনার মধ্যে রয়েছে। প্রতিদিনের রাতের খাবারে এমন অপ্রতুল পরিমাণে খাবার পরিবেশন করা হয় যে তা একজন শিক্ষার্থীর দৈনন্দিন পুষ্টির চাহিদা পূরণে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ। মাত্র এক চামচ সবজি দিয়ে রাতের খাবার দেওয়া হয়, যা অপমানজনক এবং স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এছাড়া, দুপুরের খাবারে প্রতিদিন একঘেয়ে এবং সঠিকভাবে রান্না না করা মুরগির মাংস পরিবেশন করা হয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—হলের রান্নাঘরে ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি মানা হয় না। রান্নার জায়গা অপরিচ্ছন্ন, খাদ্য প্রস্তুতকারীদের স্বাস্থ্যনিরাপত্তা বা পরিচ্ছন্নতার কোনো ব্যবস্থা নেই, এবং খাবার পরিবেশনের সময়ও সঠিকভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা হয় না।
অন্যদিকে, সুফিয়া কামাল হলের আবাসিক শিক্ষার্থী নুসরাত ফেরদৌসী পুন্নি বলেন, রাতের বেলা অধিকাংশ সময় সবজি বা নিরামিষ খাবার দেয়া হয়। কিন্তু আমাদের অনেকেই আছে যাদের এতে অনেকটা সমস্যা হয়। প্রতিদিন দুপুরে একই রকমের খাবার খেয়ে যদি রাতেও এরকম খালি সবজি জাতীয় খাবার খেতে হয় তাহলে সেটাতে আসলে তৃপ্তি হয় না।
এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চুয়েট নিউজের সাথে কথা হয় মেয়েদের তিন হলের প্রভোস্ট ও ডাইনিং ম্যানেজারদের সাথে।
এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাপসী রাবেয়া হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড.মোছাঃ রোকসানা খাতুন তার হলে তুলনামূলক কম ডাইনিং ফি নেয়ার ব্যাপারটি তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, অন্যান্য হলে ডাইনিংয়ের জন্য বিভিন্ন সময় আলাদা অর্থ জমা নেয়া হয়। তিনি আরও বলেন, ফিস্টের জন্য অন্য হলগুলোতে আলাদা অর্থ নেয়া হয়, যা আমাদের এখানে নেয়া হয় না। আর কারও খাবারে সমস্যা হলে আমাদের কাছে আসতে হবে। আমাদের সঙ্গে আলোচনা করলে ব্যাপারটা ফলপ্রসূ করা যাবে। আর এখন তো ডাইনিং ভালোই চলছে। অন্যান্য হলে যেভাবে বাড়তি ফি নেয়া হয়। সেভাবে এখানে নিলেও আরো ভালো খাবার দেয়া সম্ভব।
এ তথ্যের ভিত্তিতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ছেলেদের হলগুলোতে ডাইনিং ফি ২৫০০ টাকা এবং তাপসী রাবেয়া হলে ২৪০০ টাকা। অর্থাৎ, ছেলেদের হলের তুলনায় এ হলে মাত্র ১০০ টাকা কম নেয়া হয়।
আবার শামসেন নাহার খান হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. রাজিয়া সুলতানা চুয়েটনিউজ২৪ কে বলেন, অধিকাংশ সময়ে দুপুরের খাবারে মুরগির মাংস দেয়া হয়। রাতে দেয়া হয় সবজি, ডাল অথবা মাছ। কেউ পছন্দ না করলে ডিম দেয়া হয়। আমরা চেষ্টা করি প্রোটিনের চাহিদা যাতে পূরণ করা সম্ভব হয়। খাবারের মেনুতে কী থাকবে এটা মেয়েরাই ঠিক করে। তারাই বাজার করে। ওরা নিজেরা দুবেলা মাছ বা মুরগী পছন্দ করে না। আর এখানে খাবারের গুণগত মান ও ভিন্নতা বজায় রাখা হয়। মিল প্রতি ৪০ টাকায় মেয়েরা যদি দুবেলা মুরগির মাংস ম্যানেজ করতে পারে এই অর্থের মধ্যে, তাহলে অবশ্যই দেয়া যাবে।
এসময় তিনি দাবি করেন, চুয়েটের কোনো হলেই দুবেলা মাছ বা মুরগির মাংস দেয়া হয় না। এমন তথ্যের ভিত্তিতে চুয়েটের বাকি পাঁচটি ছাত্র হলে খোঁজ নেয়া হলে তার প্রদানকৃত এ তথ্যের কোনো সত্যতা পাওয়া যায় নি। বরং সব ছাত্র হলেই দুবেলা মাছ/মাংসের ব্যবস্থা থাকে।
অন্যদিকে সুফিয়া কামাল হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড.মোছাঃ ফারজানা রহমান জুথি জানান, খাবারের ব্যবস্থাপনায় সবসময় মেয়েরাই থাকে। তাদেরই সিদ্ধান্ত। আমরাও চাই মেয়েরা প্রতিবেলা প্রোটিন খাক। কিন্তু তারা অনেকেই বলে যে রাতে ডায়েট করে বা রাতে ডাইনিংয়ে খায় না। আসলে মেয়েদের হলের ডাইনিং ম্যানেজার মেয়েদেরই। তারাই মেন্যু ঠিক করে। কারও অভিযোগ থাকলে আমরা ডাইনিং ম্যানেজারকে ডাকি কিন্তু তখন অভিযোগকারীকে আর পাওয়া যায় না।
তবে সুফিয়া কামাল হলের ডাইনিং ম্যানেজার নাজিয়া সুলতানা এ ব্যাপারে জানালেন ভিন্ন কথা। তিনি দাবি করেন তার হলে বর্ডার সংখ্যা অন্যান্য হলের তুলনায় কম। তিনি আরও বলেন, আমাদের হলে পর্যাপ্ত বর্ডার নেই যে আমরা দুবেলা মাছ-মাংস দিতে পারব। আর এ হলে অনেকে দুপুরে খেয়ে রাতের টোকেন ফেরত জমা দিয়ে যায়, এতে রাতের বর্ডার আরো কমে। এমতাবস্থায় মান বজায় রেখে রোজ দুবেলা মাছ-মাংস দেয়া সম্ভব হয়ে উঠে না।
এছাড়া পার্শ্ববর্তী শামসেন নাহার খান হলের ডাইনিং ম্যানেজার মুমতাহিনা আলম আনিতার সঙ্গেও চুয়েটনিউজ২৪ এর যোগাযোগ হয়। তার হলে যথেষ্ট পরিমাণ বর্ডার থাকা সত্ত্বেও কেন ছেলেদের হলের মত দুবেলা মাছ-মাংস দেয়া সম্ভব হয় না এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করি ভালো খাবার দেয়ার। কিন্তু দুবেলা মুরগী দিলে দেখা যায় মিল রেটটা মাইনাসে চলে যায়। আর বাজার করার জন্যও আমাদের কাছে বেশি পরিমাণ টাকা একসাথে দেয়া হয় না। তাহলে হয়ত আরো ভালো বাজার করা সম্ভব হত।
এছাড়া, তাপসী রাবেয়া হলে খোঁজ নিলে চলতি মাসে এ হলে কোনো ডাইনিং ম্যানেজার নেই বলে জানা যায়। এমতাবস্থায় অফিস থেকে ডাইনিং চালানো হচ্ছে বলে সূত্র জানায়। তাই উক্ত হলের ডাইনিং ম্যানেজারের বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয় নি।
খাবারের ভিন্নতার এমন উদ্ভুত পরিস্থতির ব্যাপারে ছাত্রকল্যাণ অধিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড.মো.মাহবুবুল আলমের সঙ্গে চুয়েটনিউজ২৪ এর কথা হয়। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে প্রভোস্টদের সঙ্গে কথা বলব। ব্যাপারটা আসলে কি, কিছু হল এরকম মাছ মাংসের ব্যবস্থা করতে পারে, আবার কিছু হল পারে না, এটা তো হতে পারে না। যারা এটা পারে তারা কিভাবে ম্যানেজ করে সেটাও দেখতে হবে। আর আগে সমস্যাগুলোও কোথায় এটাও আমরা জানি। তারপর দেখা যাক আমরা কি করতে পারি।
উল্লেখ্য, চুয়েটে বর্তমানে আটটি হল রয়েছে। যার মধ্যে ছেলেদের হল পাঁচটি, মেয়েদের হল তিনটি।মেয়েদের সবকয়টি হলেই বাধ্যতামূলক ভাবে টোকেন কাটার নিয়ম রয়েছে। তবুও, রাতের ডাইনিং নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এমন অভিযোগ ও অসন্তোষ চলমান রয়েছে জানা যায়।