You are currently viewing তারুণ্যের জোয়ারে বিদায়ের সুর

তারুণ্যের জোয়ারে বিদায়ের সুর

  • Post published:November 25, 2021
  • Post comments:0 Comments

কামরুজ্জামানঃ

প্রাণের ১৭১ জুড়ে এখন বিদায়ের সুর। আর মাত্র একটি সেমিস্টার পরে চলে যাচ্ছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের(চুয়েট) এর ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা।

স্বপ্নাতুর চোখে এক ঝাঁক শিক্ষার্থী চার বছর আগে কোনো এক কুয়াশাঘেরা সকালে এই প্রিয় প্রাঙ্গণে পা রেখেছিলো। হলের বারান্দা, ক্লাসরুম আর পদ্মা মেঘনা বাস গুলোয় হাজারটা স্মৃতি ঘেরা বসন্ত কাটিয়ে সেদিনের সেই কুঁড়িগুলো আজ পরিস্ফুটিত পুষ্প। পুষ্পের ও সীমা রয়েছে, তাকে ও একদিন প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম ‘ফুল আমি ধন্য মাটির পরে’ মানতে হবে। সেই নিয়মে এই বসন্তের শেষে ‘১৬ ব্যাচের ৭০০ টি ফুল ও ঝড়ে যাবে।

কিন্তু কবি নজরুল তো বলেছেন, আজো তবু হেসে যাও বিদায় বেলায় কেঁদো না। তাই তো চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের ৭১ জন শিক্ষার্থী বেরিয়ে পড়লেন নারিকেল জিঞ্জিরার(সেন্ট মার্টিন) উদ্দেশ্যে।

যেভাবে শুরু

দীর্ঘ দেড় বছর পর, গত ২৮ অক্টোবর চুয়েটে সশরীরে পরীক্ষা শুরু হয়। অনেক দিন পর পরীক্ষার পড়াশোনা নিয়ে যখন সবাই খুব হাঁপিয়ে উঠেছে তখন চুয়েটের শহীদ মোহাম্মদ শাহ হলের শিক্ষার্থীরা প্রস্তাব দিলো পরীক্ষা শেষে র‍্যাগ(বিদায়ী) ট্যুর দেওয়া যায় কিনা। প্রথমে ১১ নভেম্বর পরীক্ষা শেষে যাওয়ার প্রস্তাব উঠলে, চুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা ১৩ নভেম্বর থাকায় সবাই সিদ্ধান্ত নিলেন ২০ তারিখ রাতে সেন্ট মার্টিনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবেন।

প্রস্তুতি

র‍্যাগ ট্যুরের প্রথম প্রস্তুতি শুরু হয় পুরকৌশল বিভাগে শিক্ষার্থী সাব্বির উল ইসলামের হাত ধরে। তিনি ভ্রমণের ব্যানার ডিজাইন করেন। এরপর সবাই মিলে প্রথমে শিক্ষার্থীদের তালিকা করা, টাকা ওঠানো,ব্যানার,টিশার্ট বানানো, বাস ভাড়া করা, জাহাজের টিকিট কাটা, হোটেল ভাড়া করা সহ আনুষঙ্গিক সকল কাজ সম্পন্ন করেন।

যাত্রা

২০ তারিখ রাত ১১ টায় বিশ্ববিদ্যালয়ে দুইটি বাস আসে। বাসে ব্যানার টানিয়ে ও শিক্ষার্থীদের মাঝে টি শার্ট বিতরণ করে রাত ১২ঃ৩০ এ শিক্ষার্থীরা টেকনাফের উদ্দেশ্যে রওনা হন। চুয়েট থেকে টেকনাফ দীর্ঘ ১৮০ কিঃমিঃ এর যাত্রা শিক্ষার্থীদের হই হুল্লোড় আর নাচ গানে যেন মুহূর্তের মধ্যেই ১৮০ কিঃমিঃ ব্যাপী কন্সার্ট হয়ে গেল।

২১ তারিখ ভোরে টেকনাফে সেদিন সুর্যোদয় হলেও ভোরের কিরণ হিসেবে যেন ওরা ৭১ জনই পৌঁছেছিলো। এর পর সকাল ৯ টায় কেয়ারী সুকান্ত বাবুর ডেকে আরেকবার প্রাণের জোয়ার। গাংচিল আর সমুদ্রের স্রোত যেন সেদিন তারুণ্যের প্রাণচাঞ্চল্যে ঐকতান দিয়েছিলো। এভাবেই গানে গানে তারা সাড়ে ১২ টায় পৌঁছে যায় সেন্ট মার্টিন।

জাহাজে শিক্ষার্থীদের একাংশ

নারিকেল জিঞ্জিরায় তারুণ্যঃ

একঘেয়ে রুটিন ঘেরা জীবন থেকে কিছুটা মুক্তির খোঁজে প্রথমেই তরুণেরা সমুদ্র স্নানে মেতে ওঠে। এরপর বিকেলে সাইকেল দিয়ে সৈকতে ঘুরে বেড়ানো, আর রাতে রাজ্যের ক্ষুধা নিয়ে সামুদ্রিক মাছের বার-বি-কিউ যেন তাদের অনুভবে রোমাঞ্চ ঘেরা মাদকতা তৈরি করেছিল।

ফিরে আসার আগে বীচ ফুটবলে মেতে উঠেছেন শিক্ষার্থীরা ।

পরদিন ২২ নভেম্বর কেউ হেঁটে, কেউবা সাইকেলে করে বেরিয়ে পড়ে ছেঁড়া দীপের উদ্দেশ্যে। বাংলাদেশের সর্বশেষ স্থলভাগ যেন সেদিন এক খণ্ড চুয়েট পুরকৌশলের মিলন মেলায় পরিণত হয়েছিলো। এরপর সেদিন রাতের বার-বি-কিউ তে তরুণদের জন্য পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটিতে পরিণত হয়েছিলো।

র‍্যাগ ট্যুরের টি-শার্ট পরিহিত ছেঁড়া দ্বীপে শিক্ষার্থীদের একাংশ ।

খাওয়া দাওয়া শেষে উকুলেলে, গীটার আর ভরাট গলার উদাস গানের তালে চন্দ্র-শোভা যেন আরো উজ্জ্বল, আরো মোহনীয় হয়ে ধরায় নৃত্য করছিলো।

ফেরা

২৩ তারিখ প্রভাতে শিক্ষার্থীদের ফেরার সময় হাজির, জীবনানন্দ দাশ বোধ হয় এই মুহূর্তের জন্যই লিখেছিলেন,গভীর দুঃখে মগ্ন সমস্ত আকাশ, সমস্ত পৃথিবী !

বিদায়ের বেলায় গোধূলিতে বঙ্গোপসাগরের বুক কেটে ধীরে ধীরে জাহাজ এগুচ্ছিলো টেকনাফের দিকে, আর ওরা ৭১ জন ডুবন্ত সূর্যের সৌন্দর্যে একরাশ স্মৃতি ভাসিয়ে ফিরে আসছিলো সেই চিরচেনা জীবনে।

জীবনানন্দ দাসকে অনুকরণ করে বলতে চাই আবার ওরা ফিরে আসুক এই জলঙ্গীর ঢেউ এ ভেজা বাংলারি সবুজ করুণ ডাঙ্গায়।

তারিখঃ ২৬ নভেম্বর, ২০২১

Leave a Reply