চুয়েটনিউজ২৪.ডেস্ক:
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) শিক্ষার্থীদের বহনকারী ঢাকাগামী বাসে হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত ১৯ জুলাই ভোর পৌনে পাঁচটা নাগাদ ঢাকা-চট্রগ্রাম রোড অতিক্রম করার পর চুয়েট বাসে নাশকতাকারীরা এ হামলা চালায়।

শিক্ষার্থী সূত্রে জানা যায়, গত ১৮ই জুলাই রাতে সংক্ষিপ্ত বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষার্থীদের তাৎক্ষণিক হল ত্যাগের নির্দেশ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ । এসময় শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার জন্যে ঢাকার উদ্দেশ্যে তিনটি বাসের ব্যবস্থা করা হয়।
দেশের নাজুক পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের নিরাপত্তার নিয়ে শঙ্কিত হওয়ায় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের বাসে পুলিশি নিরাপত্তার আশ্বাস দেয়। তবে বাস ছাড়ার আগ মুহুর্তে নিরাপত্তার ব্যবস্থা স্বরূপ শিক্ষার্থীদেরকে শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার স্বাক্ষরিত একটি অনুমোদন পত্র প্রদান করা হয় বলে জানা যায়।

উপস্থিত সময়ে আর কোথাও যাওয়ার যায়গা না থাকায় শিক্ষার্থীরা ঐ বাসগুলোতে করেই ঢাকা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে ১৮ই জুলাই রাত ১১ টার দিকে তিনটি বাস (টিডিএম পরিবহন) একসাথে ঢাকার উদ্দেশ্যে শিক্ষার্থীদের নিয়ে যাত্রা শুরু করে। কুমিল্লা যাওয়ার পর বাসগুলো থেকে উল্লেখযোগ্য শিক্ষার্থী নেমে যাওয়ায় শুধু একটি বাস শিক্ষার্থী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
১৯শে জুলাই ভোর পৌনে পাঁচটা নাগাদ চিটাগাং রোড অতিক্রম করার সময় নারায়ণগঞ্জের রায়েরবাগ এলাকায় পৌঁছালে বাসটিতে অতর্কিত হামলা চালায় নাশকতাকারীরা। এতে বাসে থাকা সকল শিক্ষার্থী প্রচন্ড আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তখন শিক্ষকদের সাথে যোগাযোগ করে কোন সহায়তা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা।
চুয়েটেরযন্ত্রকৌশল বিভাগের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী পারভেজ মোশাররফ সেই ঘটনা বর্ণনা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেন, “প্রচন্ড শব্দে বাসের জানালার কাচগুলো ছুড়ে মারা ইটে গুড়া গুড়া হয়ে ভেংগে পড়ল। ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই মাথা নিচু করে বসে পড়লাম। বাস ড্রাইভার ও প্রচন্ড ভয় পেল। বাসের কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলায়,বাসটি বাউলি খেল পরপর দুটি। কিন্ত ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস একটু যেতেই প্রচন্ড জ্যাম। বাস আটকে গেল। আমরা প্রায় জীবন হাতে রেখে বসে আছি।আমরা যখন শনি আখরা জ্যামে তখন শুধু ভাবছিলাম সন্ত্রাসীদের দশ মিনিটও লাগবে না দৌড়ে আমাদের বাস ধরে ফেলতে। এরপর যেকোনো কিছুই হতে পারে। আমরা যে যার মত শিক্ষকদের সাথেও যোগাযোগ এর চেষ্টা করছিলাম। দুই একজন সাজেশন দিলেন বাস থেকে নেমে দৌড়িয়ে আশেপাশের কোনো মসজিদ-মাদরাসায় চলে যেতে। শুধু এতটুকু ভাবেন চল্লিশ জন শিক্ষার্থী বাস থেকে নামতেছে এমন এলাকায় যেখানে একটু আগেই তাদের উপর এটাক হয়েছে। যে এলাকা আমরা চিনি না। ঠিক এরমধ্যে বামপাশের রোড ডিভাইডারের উপর কারও চোখ গেল। সাথে সাথে সে চিৎকার দিয়ে বলল লা-শ লা-শ। আমরা তাকিয়ে জলজ্যান্ত একটা লা-শ দেখলাম। এর মাঝে এক জুনিয়র প্রচন্ড ভয় পেল। সে বাসের দুইপাশে যে সিটগুলো থাকে তার মাঝামাঝি হাটার জন্য রাখা জায়গায় মাথা ঘুরে পড়ে গেল।যেকোনো সময় অঘটন ঘটে যেতে পারত। আমরা তাকে সাহস দিয়েও কিছুর কুলকিনারা পেলাম না।”
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উপর ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি লিখেন, “বানোয়াট আর মিথ্যে পুলিশ প্রটেকশনের নামে কমপক্ষে চল্লিশ-পঞ্চাশ জন শিক্ষার্থীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে এই চুয়েট প্রশাসন আর চুয়েটের ছাত্রকল্যাণ দপ্তর। ঘটনার পর প্রথমেই আমরা সাইফুল স্যারকে ফোন দিলাম। উনি কাগজে দেওয়া নাম্বারে (ওসি হারুন) যোগাযোগ করতে বললেন। কাগজের নাম্বারে ফোন দিলে বলে তাদের রেঞ্জ শুধু চিটাগং পর্যন্ত। তারা ঢাকাতে কোনো হেল্প করতে পারবে না।আবার স্যারকে ফোন দিলে তিনি বলেন যাতে আমরা ডিএমপি এর সাথে যোগাযোগ করি। এরপর প্রায় দুইঘন্টা যাবৎ যখন যেই নম্বর পেয়েছি আমরা চেষ্টা করেছি যাতে একটু সাহায্য পাওয়া যায়। কিন্তু আফসোসের কথা কেউই আমাদের সাহায্যের জন্য আসেনি। যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারে পুলিশ শিক্ষার্থীদের বাসটি আটকে দিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন থেকে যে অনুমোদন পত্র দেয়া হয়েছিল তা কোন কাজে আসেনি। “
চুয়েটের ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ১৯ শিক্ষার্থী প্রণয় বিশ্বাস রুদ্র তার অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে বলেন, আমরা যখন ঐদিন রায়েরবাগ পৌঁছে যাই তখন আমাদের উপর মুলত আক্রমণ করা হয়। ইট,পাটকেল নিক্ষেপ হয় আমাদের গাড়িতে। আমাদের বাসের সকল কাঁচ ভেঙ্গে যায়।তখন বাসে অবস্থানরত চুয়েটিয়ানরা প্রচন্ড ভয় পায়। একটু আগানোর পরেই আমারা দেখি রাস্তার পাশে লাশ। তখন আমরা মূলত আমাদের স্যারদের ফোন দেই এক স্যার থেকে অন্য স্যার কিন্তু ঐ মুহুর্তে কোনো পুলিশ কর্মকর্তা আমাদের সাহায্য করতেই চায়নি। ৯৯৯ ফোন দেওয়ার পরও একই কাহিনী কেউ সাহায্য করতেই নারাজ। এরপর যখন আমাদের বাস হানিফ ফ্লাইওভারে উঠি আমাদের বাস আটকে দেয় পুলিশ সদস্য, তারাও তখন আমাদের সহায্য করবে না এবং এক পর্যায়ে আমাদের ফেরত যেতে বলে। এরপর স্যারদের আবার কল দিয়ে যাত্রাবাড়ী থানার ওসির সাথে আবার কথা বলে রাস্তার ক্লিয়ারেন্স নিতে হয় তারপর আমাদের যেতে দেওয়া হয়।
চুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রফিকুল আলম এ ব্যপারে চুয়েটনিউজ২৪ কে বলেন, আমি পুলিশ সুপার ও অন্যান্য উর্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে রেখেছিলাম। যাত্রাপথে প্রতিটি পয়েন্টে আমি উনাদের সাথে যোগাযোগ করেছি। ঘটনাটি ঘটার পর নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারের সাথেও আমার কথা হয়েছে। আমি সারারাত ঘুমাইনি। খোঁজ খবর নিয়েছি। আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চটাই চেষ্টা করা হয়েছে।
উক্ত ঘটনার ব্যপারে চুয়েটের ছাত্রকল্যাণ দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো: রেজাউল করিম বলেন, আমরা আমাদের সাধ্যমত যেখানে যেখানে যোগাযোগ করা দরকার যোগাযোগ করেছি, পুলিশ ওই অবস্থায় যতটুকু সম্ভব হয়েছে ততটুকু সাহায্য করেছে। ভিসি স্যার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন , যেখানে যেখানে পুলিশ আছে সেখানে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছেন। সেখানে পুলিশই হয়তো সময় নিয়েছে বা তারাও হয়তোবা তাদের সংশ্লিষ্ট দের সাথে তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করতে পারিনি সেজন্য হয়তো সময় লেগেছে। পুলিশ স্টপেজে প্রশাসন কর্তৃক প্রদানকৃত অনুমোদন পত্রের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, লোকাল পুলিশ থেকে যেভাবে বলা হয়েছে রেজিস্ট্রার কর্তৃক সেভাবেই চিঠি লিখে দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগ করতে বাধ্য করার পিছনে কোনো রাজনৈতিক চাপ ছিল কিনা এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোন ধরনের রাজনৈতিক চাপ আসে নাই। সরকারের আদেশক্রমেই হল থেকে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে না হলে সরকার থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা ছিল।