ইবাদ হোসেন:
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) দ্বিতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছে আন্তর্জাতিক প্রকৌশলভিত্তিক আয়োজন ‘ইএফএক্স ২০২৬’। শনিবার (২৫ জুলাই) ‘প্রকৌশল, ক্ষমতায়ন ও উৎকর্ষ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনকিউবেটর ভবনে দিনব্যাপী এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। আমেরিকান সোসাইটি অব মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার্স (এএসএমই) চুয়েট স্টুডেন্ট চ্যাপ্টারের উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থী, প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন আইটি প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।
দিনব্যাপী এ আয়োজনে উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতা, জননীতি ও সমস্যা সমাধানভিত্তিক কেস স্টাডি, বিষয়ভিত্তিক কারিগরি সেশন এবং শিল্পখাতের শীর্ষ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ পান অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা।
সকাল সাড়ে ১০টায় অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথি চুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাহমুদ আব্দুল মতিন ভূইয়া। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যন্ত্রকৌশল অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, চুয়েটের ইনস্টিটিউট অব এনার্জি অ্যান্ড টেকনোলজির পরিচালক অধ্যাপক ড. জামাল উদ্দিন আহমেদ এবং এএসএমই চুয়েট চ্যাপ্টারের মডারেটর সহযোগী অধ্যাপক মো. আমিনুল ইসলাম।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. জামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, “এএসএমই একটি বৃহৎ সংগঠন। আমার নিজেরও এএসএমইর জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। আমার বিভাগের এ ক্লাবের জন্য আমি সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব। আমার চোখে এ ক্লাবের প্রতিটি সদস্যই অত্যন্ত কর্মঠ। যন্ত্রকৌশল বিভাগের আয়োজনে আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য ধন্যবাদ। এ আয়োজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাইকে সাধুবাদ জানাই।”
উদ্বোধনী পর্বের পর পরই শুরু হয় জননীতি ও সমস্যা সমাধানভিত্তিক জাতীয় প্রতিযোগিতা ‘পলিসিল্যাব: তাৎক্ষণিক প্রকৌশল নীতিনির্ধারণ চ্যালেঞ্জ’-এর চূড়ান্ত পর্ব। প্রাথমিক পর্বে অংশ নেওয়া ১৪টি দলের মধ্য থেকে বাছাই হওয়া সাতটি দল বাস্তব জাতীয় ও নীতিনির্ধারণ-সংশ্লিষ্ট সমস্যার প্রকৌশলভিত্তিক সমাধান বিচারকদের সামনে উপস্থাপন করে।
প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া টিম আল-মাসার-এর সদস্য এবং যন্ত্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আসিফ হাসান বলেন, “মেডিকেল খাতের সঙ্গে প্রকৌশলের সংযোগকে কেন্দ্র করে পলিসিল্যাব প্রতিযোগিতাটি দুই ধাপে অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম ধাপে আমরা একটি নীতিপ্রস্তাব জমা দিই। পরে বাছাইকৃত দলগুলো চূড়ান্ত পর্বে সেই প্রস্তাব উপস্থাপন করে। মূল বিষয় ছিল, বাংলাদেশে মহামারি বা ব্যয়বহুল চিকিৎসাজনিত সমস্যার সমাধানে প্রকৌশলভিত্তিক নীতিমালা তৈরি করা। আমাদের দল একটি ‘স্ক্যাফোল্ড’ নকশা উপস্থাপন করেছে, যা ত্বকের ক্ষত নিরাময়ে কার্যকর হতে পারে এবং অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন কমাতে সহায়ক। পাশাপাশি একটি ওয়েবভিত্তিক ব্যবস্থা প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে রোগীর ছবি বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া সম্ভব হবে।”
মাত্র ৯০ সেকেন্ডে শিক্ষার্থীরা নিজেদের উদ্ভাবনী ধারণা, দক্ষতা ও সম্ভাবনাময় উদ্যোগ উপস্থাপন করেন ‘এলিভেটর পিচ’ প্রতিযোগিতায়। এতে অংশ নেয় ২৪ জন প্রতিযোগী । স্বল্প সময়ে আত্মবিশ্বাসী ও কার্যকর উপস্থাপনার মাধ্যমে সম্ভাব্য নিয়োগকর্তা ও শিল্পখাতের প্রতিনিধিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই ছিল এ প্রতিযোগিতার মূল উদ্দেশ্য।
দুপুরের বিরতির পর অনুষ্ঠিত হয় ‘প্রকৌশল থেকে উদ্যোক্তা হওয়ার পথ’ শীর্ষক আলোচনা। এতে হিন্টন বিট করপোরেশনের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালন বিভাগের পরিচালক এস. এম. সাকিফ সানি প্রকৌশল শিক্ষা থেকে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা, নতুন উদ্যোগ গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ এবং উদ্ভাবনী ধারণাকে সফল উদ্যোগে রূপ দেওয়ার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
এরপর ‘প্রকৌশলে পেশা গঠনের নানা পথ’ শীর্ষক আলোচনায় অনলাইনে যুক্ত হয়ে ইন্দোনেশিয়ার পিটি আইনুল হায়াত সেজাহতের কমিশনিং প্রকৌশলী শিলাব্রত বড়ুয়া দেশ-বিদেশে প্রকৌশলীদের কর্মক্ষেত্র, প্রয়োজনীয় দক্ষতা উন্নয়ন এবং পেশাগত প্রস্তুতি বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন।
দিনব্যাপী কর্মসূচি শেষে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। এলিভেটর পিচ প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করেন যন্ত্রকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রশিদ আবরার আজমাইন। প্রথম রানার্স-আপ হন একই বর্ষের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী আনিকা তাহসিন পৃথ্বী এবং দ্বিতীয় রানার্স-আপ হন যন্ত্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী নাভিয়া হাসান।
অন্যদিকে, পলিসিল্যাব প্রতিযোগিতায় দলীয় চ্যাম্পিয়ন হয় ‘সিনসিয়ারলি ইয়োরস’। প্রথম ও দ্বিতীয় রানার্স-আপ হয় যথাক্রমে ‘আপ লেনিনস্টার’ এবং ‘টিম ক্যাপসিকাম’।
এএসএমই চুয়েট চ্যাপ্টারের সাধারণ সম্পাদক, যন্ত্রকৌশল বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আহাদ বিন আজাদ বলেন, “এএসএমই-এর পথচলা তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত হলেও এর বিপুল সম্ভাবনা ও সুযোগ নিয়ে যে একে আরও বহুদূর যেতে হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত ‘ইএফএক্স’ আয়োজন করতে পারা সেই সম্ভাবনারই একটি বড় প্রমাণ।”
এএসএমই চুয়েট চ্যাপ্টারের ব্রাঞ্চ চেয়ার, যন্ত্রকৌশল বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন বলেন, “গত সাত মাসের পরিকল্পনা এবং দলের প্রতিটি সদস্যের আন্তরিক সহযোগিতায় দ্বিতীয়বারের মতো আমরা ‘ইএফএক্স’ আয়োজন করতে সক্ষম হয়েছি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চুয়েটের নাম আরও উজ্জ্বলভাবে তুলে ধরা এবং তরুণ প্রকৌশলীদের মেধা বিকাশের জন্য একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করাই ছিল আমাদের মূল লক্ষ্য। ভবিষ্যতেও এএসএমই এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারবে বলে আমরা আশাবাদী।”