ফাইয়াজ কৌশিকঃ-
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) ক্যাম্পাসে আজ দিনভর ছিল পুরকৌশল শিক্ষার্থীদের এক প্রাণবন্ত মিলনমেলা। ক্যাম্পাসজুড়ে টানানো ব্যানার ও ফেস্টুন, আর সুশৃঙ্খল সাজসজ্জা পুরো পরিবেশকে যেন দিয়েছে উৎসবের আবহ। কেউ ব্যস্ত কুইজের প্রস্তুতিতে, কেউ আবার শেষ মুহূর্তে গবেষণার পোস্টার গোছাতে। পাশেই ছোট ছোট দলে শিক্ষার্থীরা আলোচনা করছেন টেকসই নির্মাণসামগ্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে। সব মিলিয়ে পুরো ক্যাম্পাস যেন পরিণত হয়েছিল পুরকৌশল শিক্ষার্থীদের এক উচ্ছল জ্ঞান-উৎসবে।
আজ ১৯ জুন(শুক্রবার) চুয়েটের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে আমেরিকান কংক্রিট ইনস্টিটিউট (এসিআই) চুয়েট চ্যাপ্টারের উদ্যোগে দিনব্যাপী এই আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। চুয়েট ছাড়াও এতে অংশ নেয় দেশের আটটি বিশ্ববিদ্যালয়—বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), আহছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, তথ্য প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয় (UITS), আন্তর্জাতিক ব্যবসা, কৃষি ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (IUBAT)সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এসিআই স্টুডেন্ট চ্যাপ্টার।
শুধু প্রতিযোগিতা নয়, গবেষকদের অংশগ্রহণে আয়োজনটি হয়ে উঠেছিল অভিজ্ঞতা বিনিময়ের এক উন্মুক্ত মঞ্চ। শিক্ষক, গবেষক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে পুরো দিনজুড়ে চলেছে আলোচনা, প্রতিযোগিতা আর উপস্থাপনার ধারাবাহিকতা।
দিনের শুরুতে অনুষ্ঠিত হয় কুইজ ও বিজনেস কেস প্রতিযোগিতা। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখানে নিজেদের জ্ঞান, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও সৃজনশীলতার পরীক্ষা দেন। একই সঙ্গে নির্মাণ খাতে টেকসই উন্নয়ন নিয়ে মত তুলে ধরেন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। বক্তব্য দেন বিএসআরএম, হোলসিম ও পিডিএলের কর্মকর্তারা।
দুপুর ১২ টার দিকে অনুষ্ঠিত হয় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী পর্ব। এসময় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মাহমুদ আব্দুল মতিন ভূইয়া, চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক রিয়াজ আকতার মল্লিক, এসিআই বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সম্পাদক অধ্যাপক রুপক মাতসুদ্দি ও সভাপতি তারেক উদ্দিন, এসিআই বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের পরিচালক ও চুয়েট এসিআই এর অনুষদ উপদেষ্টা অধ্যাপক জিএম সাদিকুল ইসলাম। এসময় তাদের আলোচনায় উঠে আসে দেশের নির্মাণ শিল্পের বর্তমান বাস্তবতা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ।
দুপুরের বিরতির পর শুরু হয় আয়োজনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব—‘মর্টার কার্যক্ষমতা পরীক্ষা প্রতিযোগিতা’। সিমেন্ট, বালি ও পানির নির্দিষ্ট অনুপাতে মর্টার তৈরি করে শিক্ষার্থীরা তার কার্যক্ষমতা পরীক্ষা করেন। যে দলের মিশ্রণ সবচেয়ে উপযুক্ত ও ব্যবহারযোগ্য ফল দেয়, তারাই বিজয়ী হিসেবে নির্বাচিত হয়।
প্রতিযোগিতা শেষে অনুষ্ঠিত হয় টেকসই নির্মাণসামগ্রী নিয়ে বিশেষ সেমিনার ও প্রশ্নোত্তর পর্ব। এতে অংশ নেন বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আ.ফ.ম সাইফুল আমিন এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুর ও পরিবেশকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মুশতাক আহমেদ।
দিনের শেষভাগে আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এসিআই স্টুডেন্ট চ্যাপ্টারের কার্যক্রম, অর্জন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। এসময় পোস্টার প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের গবেষণা ও উদ্ভাবনী ভাবনাও উপস্থাপন করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে চুয়েটের উপাচার্য বলেন,” বাস্তব অভিজ্ঞতা, গবেষণা ও শিল্পখাতের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যমেই একজন দক্ষ প্রকৌশলী গড়ে ওঠে। এমন আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় আয়োজন শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞান ও দক্ষতার বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করে। টেকসই নির্মাণ ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তির দিকে মনোযোগী হতে হবে ভবিষ্যৎ প্রকৌশলীদের। এ ধরনের উদ্যোগ দেশের নির্মাণ খাতকে আরও এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
চুয়েট এসিআই এর অনুষদ উপদেষ্টা অধ্যাপক জিএম সাদিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা আমাদের এই আয়োজনের পৃষ্ঠপোষকদের ধন্যবাদ জানাই আমাদের পাশে থাকার জন্য। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এই আয়োজন গুছিয়ে করার জন্য কাজ করেছে, পরিশ্রম করেছে। এই ধরনের আয়োজন সারাদেশজুড়ে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও হলে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা ও পেশাগত প্রস্তুতি আরও সমৃদ্ধ হবে।”
আয়োজন সম্পর্কে ইসলামি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাইসা চৌধুরী চুয়েটনিউজ২৪কে বলেন, “এখানে এসে খুব ভালো লেগেছে। পুরো আয়োজনটাই ছিল সুশৃঙ্খল। আলাদা করে সবার জন্য ব্যবস্থা ছিল, কোনো ভোগান্তি হয়নি। অনেক কিছু শিখতে পেরেছি।”
বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার মাহমুদ চুয়েটনিউজ২৪কে বলেন, “আমি আগেও চুয়েটে এসেছি। তবে এবার মর্টার প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে এসে অভিজ্ঞতাটা আরও সমৃদ্ধ হয়েছে। আয়োজন ও ব্যবস্থাপনা সত্যিই প্রশংসনীয়।”
আয়োজকদের পক্ষ থেকে এসিআই চুয়েট এর সভাপতি আসহাব লাবিব চুয়েটনিউজ২৪কে বলেন, “এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা যেমন একে অপরের সঙ্গে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ পাচ্ছে, তেমনি বাস্তব প্রকৌশল সমস্যার সঙ্গে পরিচিত হওয়ারও সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যৎ প্রকৌশলীদেরকে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং শিল্পখাতের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হতে হবে। এসিআই সবসময় শিক্ষার্থীদের পাশে থেকে এ ধরনের উদ্যোগকে উৎসাহিত করে যাবে।”