শিক্ষার্থীদের শর্তে চুয়েট ছাড়লেন উপাচার্য, উদ্ধার আরও ১০ জন

জারীন তাসমীন সাবা:

নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে আর চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে না দেওয়ার শর্তে তাঁকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি দিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের উপস্থিতিতে উপাচার্যসহ ১১ জনকে উপাচার্য ভবন থেকে বের করে ক্যাম্পাসের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে কঠোর পুলিশ পাহারায় তাঁদের সরিয়ে নেওয়া হয়।

সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে আন্দোলন করছেন চুয়েটের শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও শিক্ষার্থীরা তাঁদের দাবি থেকে সরে আসেননি। গত সোমবার (১২ অক্টোবর) সকালে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলে তাঁকে পদত্যাগের জন্য সময়সীমা বেঁধে দেন আন্দোলনকারীরা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পদত্যাগ না করায় তাঁকে প্রশাসনিক ভবন-২-এ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়।

মঙ্গলবার বিকালে উপাচার্যকে সেখান থেকে সরিয়ে নিতে উদ্যোগী হয় প্রশাসন। বিকাল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে চুয়েট ক্যাম্পাসে যান চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম।

জেলা প্রশাসক জানান, উপাচার্য নিরাপত্তা ও চিকিৎসার জন্য প্রশাসনের সহায়তা চেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘একজন সম্মানিত শিক্ষক আমাদের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছেন, চিকিৎসার জন্য বলেছেন। তাঁকে আমরা নিয়ে যেতে এসেছি। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হবে।’

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, ‘বড় ধরনের কোনো ঝামেলা ছাড়াই আমরা বিষয়টি সমাধান করতে পেরেছি। উপাচার্য একজন সম্মানিত ব্যক্তি। দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ থাকায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। একজন নাগরিক হিসেবে তাঁর চিকিৎসা নিশ্চিত করতেই আমরা এখানে এসেছি। তাঁর চিকিৎসা শেষে পরবর্তী বিষয়গুলো দেখা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘উপাচার্য এই ক্যাম্পাসেরই বড় ভাই ও অ্যালামনাই। সরকার তাঁকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। শিক্ষার্থীরা তাঁর সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হবেন কি না, সেটি ভিন্ন বিষয়। তবে বড় ভাই হিসেবে তাঁর প্রতি সম্মানজনক আচরণ করার জন্য আমরা শিক্ষার্থীদের বলেছি। শিক্ষার্থীরাও বিষয়টি বুঝেছেন এবং আমাদের সঙ্গে সম্মানজনকভাবে কথা বলেছেন। ফলে বড় ধরনের কোনো বাধা-বিপত্তি ছাড়াই উদ্ধার কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। শিক্ষার্থীদের যেসব দাবি-দাওয়া রয়েছে, সেগুলোও পরবর্তী সময়ে বিবেচনা করা হবে।’

উপাচার্যকে নিয়ে যাওয়ার আগে জেলা প্রশাসক আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। আলোচনায় শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন যন্ত্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আহনাফ শাহরিয়ার অর্ণব ও গালিব। তাঁরা উপাচার্যকে উদ্ধারে প্রশাসনের তৎপরতার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। অর্ণব বলেন, ‘এখানে চট্টগ্রামের সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রশাসনের মানুষজন উপস্থিত আছেন। আমরা জানতে চাই, আপনারা কখন আমাদের নিরাপত্তার জন্য থাকবেন? আপনারা কি শুধু সেই ভিসিকে বের করে নিয়ে যেতে এসেছেন, যিনি বহিষ্কৃত সন্ত্রাসীদের নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছেন। আমরা শিক্ষার্থীরা কি আপনাদের সন্তানতুল্য নই?’

উপাচার্যের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের হয়রানি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি আরও বলেন, ‘ক্যাম্পাসে না এসেই তিনি আমাদের শিক্ষকদের নানাভাবে হয়রানি ও হুমকি দেওয়া শুরু করেছিলেন। বিষয়গুলো আমাদের কাছে পৌঁছালে শিক্ষার্থী হিসেবে আমরা শিক্ষকদের এই অসম্মান মেনে নিতে পারিনি। এরপর তিনি আরও একধাপ এগিয়ে প্রশাসনিক ক্ষমতার বলে শিক্ষকদের পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও বেতন-ভাতা বন্ধ করে দেন। এই পর্যায়ে এসে আমরা আর তাঁকে এই ক্যাম্পাসে দেখতে চাইনি।’

আলোচনা শেষে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ভবনের ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে তল্লাশি চালিয়ে উপাচার্যসহ ১১ জনকে বের করে আনা হয়। তাঁদের মধ্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম, একজন সভাপতি, আরাফাত ও বিপ্লব ছিলেন বলে জানা গেছে। পরে তাঁদের পুলিশি পাহারায় ক্যাম্পাসের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়।

উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধে কয়েক সপ্তাহ ধরে চুয়েটে শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পাশাপাশি শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি ও স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে।