১৭তম আন্তর্জাতিক আন্ত:বিশ্ববিদ্যালয় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসব: চুয়েটের পর্দায় বিশ্বসংস্কৃতি

মো. মিসবাহ উদ্দিন

চুয়েটের মাল্টিপারপাস ভবনের মিলনায়তন কক্ষটি তখন অন্ধকার। সামনের বড় পর্দাটি আলোকের একমাত্র উৎস। আবছা আলোয় অনুমান করা যায় কক্ষে জনাপঞ্চাশেক শিক্ষার্থী উপস্থিত আছেন। উন্মুখ হয়ে সবাই পর্দায় তাকিয়ে আছেন। সেখানে ভেসে উঠছে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রিকশাচিত্রের গল্প।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) আইটি বিজনেস ইনকিউবেটরের মাল্টিপারপাস ভবনের মিলনায়তন কক্ষে এমনই এক ভিন্নধর্মী আবহ তৈরি হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিল্ম সোসাইটির উদ্যোগে আয়োজিত ‘১৭তম আন্তর্জাতিক আন্ত:বিশ্ববিদ্যালয় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসব’-এর প্রদর্শনী বসেছিল চুয়েট ক্যাম্পাসে। আয়োজনটির সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিল চুয়েটের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘জয়ধ্বনি’।

চলচ্চিত্র যে শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং মানুষের গল্প ও ভাবনা প্রকাশের শক্তিশালী ভাষা – এই বিশ্বাস থেকেই ২০০৭ সালে যাত্রা শুরু করে আন্তর্জাতিক আন্ত:বিশ্ববিদ্যালয় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসব। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের তরুণ নির্মাতাদের চলচ্চিত্র এখানে জায়গা করে নেয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বিশ্বের ৯২টি দেশ থেকে জমা পড়া ১ হাজার ২৬৯টি চলচ্চিত্রের মধ্য থেকে নির্বাচিত বিশটি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয় চুয়েটের এই বিশেষ আয়োজনে। উৎসবের ফেস্টিভ্যাল পার্টনার হিসেবে যুক্ত ছিল নরওয়ে দূতাবাস ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)।

চুয়েটের প্রদর্শনীতে স্থান পায় বাংলাদেশ, ইরান, নরওয়ে, জার্মানি, পোল্যান্ড, কিউবা, কলম্বিয়া ও ফ্রান্সের নির্মাতাদের কাজ। বাংলাদেশি নির্মাতাদের প্রদর্শিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে ছিল তানহা তাবাসসুমের ‘হোয়াট ইফ’, জুরজানি আল রুইয়ামের ‘দ্য রিবার্থ অব রিকশা আর্ট’, জয়ন্ত কুমার গায়েনের ‘ব্রাঞ্চেস অব সোলেস’, মং সাই শ্বে মারমার ‘রিগ্রেসা’ এবং মোহাম্মদ আল-আমিনের ‘দ্য ড্রিফট’।

চুয়েটের দর্শকদের জন্য প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ ছিল আন্তর্জাতিক নির্মাতাদের ভিন্নধর্মী কাজ। ইরানের আজরা আজিনের ‘শার্ভেহ’, মাহদি গাজীর ‘অ্যা ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট স্টোরি’, জিবার হোজাইতির ‘ঝিলেমো’, মোহাম্মদ গর্দিদাহকারের ‘অ্যা কালারফুল ড্রিম’, মহসিন বাজমির ‘অনলাইন কিডস’ এবং আরমান মাহরুখের ‘দ্য বারম্যান’ দর্শকদের নিয়ে যায় একেবারেই ভিন্ন কিছু গল্পের জগতে।

ইউরোপীয় নির্মাতাদের চলচ্চিত্রও প্রদর্শনীতে যোগ করে আলাদা মাত্রা। নরওয়ের ম্যাগনাস নিমাকের ‘গ্লিম্পস অব অ্যা ক্যানভাস’, পোল্যান্ডের আন্না ওলেকসানদ্রিভনা কোভালচুকের ‘থেফট ইন দ্য শ্যাডোজ’, আলেকজান্দ্রা সাশা কুতসেনের ‘দে ওয়্যার অল নেমড আনঝেলিকা’, রাদোস্লাভ ভাবঝিনিয়েকের ‘জাস্ট রাইট’, জার্মানির লিও নিউম্যানের ‘দ্য আমেজিং কিৎসুভার্স’, টোবিয়াস একারলিনের ‘অ্যা স্প্যারোজ সং’, কাথারিনা স্পোরারের ‘তেরেসা, স্টেশন বি’ এবং ফ্রান্সের মোরগান লেসিয়ুরের ‘বিনিথ দ্য স্কিন’ প্রদর্শিত হয়।

এ ছাড়া কলম্বিয়া ও কিউবার যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত ‘দ্য শেপ অ্যান্ড দ্য রুট’-ও দর্শকদের মধ্যে সাড়া ফেলে।
এসব চলচ্চিত্রে উঠে আসে বিভিন্ন দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সমাজবাস্তবতার নানা চিত্র। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের জীবনাচরণ সম্পর্কে ধারণা পান শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের মনে উঁকি দেয় নতুন প্রশ্ন, গভীর হয় জানার আগ্রহ।

জয়ধ্বনির সভাপতি মোস্তফা খালিদ বিন শামস মনে করেন, এ ধরনের আয়োজন ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক মানের সৃষ্টিশীল কাজের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে।

তার প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে চুয়েটের শিক্ষার্থীদের নিজেদের নির্মিত চলচ্চিত্রও এমন আন্তর্জাতিক মঞ্চে জায়গা করে নেবে।

একটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে এমন একটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজনের তাৎপর্য – শুধু প্রকৌশল ও প্রযুক্তির জ্ঞান নয়, শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, সংস্কৃতি ও বিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও যে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, সেই কথাটিই যেন মনে করিয়ে দেওয়া। এখানেই স্বার্থকতা ১৭তম আন্তর্জাতিক আন্ত:বিশ্ববিদ্যালয় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজকদের।

চলচ্চিত্র উৎসবের পর্দা নামল ঠিকই, কিন্তু চুয়েটের তরুণ দর্শকদের মনে রেখে গেল নতুন কিছু দেখার, ভাবার এবং হয়তো একদিন নিজের গল্পটিও পর্দায় তুলে ধরার অনুপ্রেরণা।