আসাদুল্লাহ গালিব ও ফাহিম রেজা:
অপরিকল্পিত নগরায়ন, অবকাঠামো নির্মাণে যথাযথ মানদণ্ড অনুসরণ না করার কারনে আমাদের শহরগুলোতে বাড়ছে মৃত্যু ঝুঁকি। বাংলাদেশের প্রধান দুটি মেগাসিটি ঢাকা ও চট্টগ্রাম রয়েছে ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে। গত ২১ নভেম্বর নরসিংদীতে ৫.৭ মাত্রার এই ভূমিকম্পে কেঁপে উঠে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহর। বিভিন্ন নিরাপত্তা দপ্তর শঙ্কা প্রকাশ করে বলছে পুরান ঢাকাসহ ঘনবসতিপূর্ণ স্থান সমূহে দুর্ঘটনা ঘটলে উদ্ধার কাজ চালানোও কঠিন হয়ে পড়বে।
এ নিয়ে জনমনে সৃষ্টি হয়েছে নানা প্রশ্ন আর আতঙ্ক । কিভাবে এই শহরগুলোতে দুর্যোগের ঝুঁকি কমানো যায়? প্রতিরোধ ব্যবস্থা কি হতে পারে? এসব নিয়ে কি ই বা ভাবছেন বিশেষজ্ঞরা?
বাংলাদেশের বেশিরভাগ শহর ই গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। এর ফলে যেকোনো দুর্যোগে ক্ষতির সম্ভাবনা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে। চুয়েট এর স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডীন ড. মো: রাশিদুল হাসান বলেন, “ভূমিকম্পের ক্ষতি কমাতে অবশ্যই পরিকল্পিত নগরায়নের দিকে আলোকপাত করতে হবে। উপযুক্ত নগর পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিটি ভবন নির্মাণের সময় ভবনের চারদিকে পরিমিত জায়গা ছাড়তে হবে। একটি পরিকল্পিত শহরের মধ্যে অন্তত ২৫ ভাগ রাস্তা থাকতে হবে।দুর্যোগকালীন সময়ে সহজে উদ্ধার কাজ পরিচালনার জন্য এবং মানুষ যেন বের হয়ে খোলা জায়গায় আশ্রয় নিতে পারে সেজন্য গণপরিসরের জায়গা বৃদ্ধি করতে হবে । ঢাকা, চট্টগ্রাম এর মতো বড় শহরগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা হচ্ছে অনেক বেশি পরিমাণে। এর মাত্রা বেড়ে গেলে মাটির নিচে খালি জায়গা তৈরি হয়, ফলে সেখানে সেটেল ডাউন হয় যেটি ভূমিকম্পের প্রবণতা আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার এ নজর দিতে হবে।”
পুরান ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার বিষয়ে তিনি বলেন, “রাজউক এ যখন মাস্টারপ্ল্যান করা হয় তখন পুরান ঢাকার একটা বড় অংশ জুড়ে একটি রিডেভেলপমেন্ট প্ল্যান দেওয়া হয়েছিল। এই প্ল্যানের আওতায় এই এরিয়াকে ডেমোলিশ করে আমরা বিশাল একটা জায়গায় নতুন সোসাইটি গড়ে দেব, যেখানে থাকবে বহুতল ভবন, খেলার মাঠসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থাকবে। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে এসব সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থার জায়গা এখনো দুর্বল হওয়ায় এটি আর অগ্রসর হয়নি। সুতরাং এসব বিষয়ে সরকারকে আরও নিবিড়ভাবে কাজ করতে হবে। ঘনবসতিপূর্ণ স্থানগুলোকে ধ্বংস করে রাস্তা চওড়া করতে হবে।
চুয়েটের বিষয়ে তিনি বলেন, “চট্টগ্রাম ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাতেই আছে। সেই হিসেবে চুয়েটের ভবন গুলোর ডিজাইন নির্দিষ্ট মাত্রার ভূমিকম্পের বিষয়গুলোকে বিবেচনা করেই করা হয়েছে। আমাদের এখানে পুরনো কিছু একাডেমিক ভবন ও হল আছে যেগুলো প্রায় ৫০ বছর পেরিয়ে গেছে । এখন সময় হয়েছে এগুলোকে ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করার।”
চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মোঃ আফতাবুর রহমান বলেন, ” ভূমিকম্প খুবই অনিশ্চিত একটা দুর্যোগ এটি যে কোন সময় হতে পারে । এটি কখন হবে কেউ সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারেনা। সুতরাং যারা বলে আগামী তিন দিনে ৩০টা বা ৪০টা ভূমিকম্প হবে এগুলো সম্পূর্ণ ভুল কথা। আবার ফোরশক নাকি আফটার শক এগুলোও সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারা খুবই কঠিন।”
ভূ প্রকৌশলে বিশেষজ্ঞ এই অধ্যাপক আরো বলেন, “জিওটেকনিক্যাল বিষয়টাকে আমরা খুব বেশি ইগনোর করি। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডে জিওটেকনিক্যাল ইনভেস্টিগেশন এবং ফাউন্ডেশনের বিষয়ে প্রপার ইন্সট্রাকশন দেওয়া আছে। কিন্তু তবুও ঢাকা শহরে অনেক স্থানে জায়গা ভরাট করে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে বেশিরভাগ ভবনের কোনো ডিজাইন নাই । এগুলোর সয়েল টেস্টিং হয়নি, জিওটেকনিক্যাল ইনভেস্টিগেশন হয়নি, যথোপযুক্ত ফাউন্ডেশনও দেওয়া হয়নি। এমনকি ঢাকা ও চট্টগ্রামের পরিকল্পিত শহরগুলোতেও কোনরকম দায়সারা ভাবে মাটি পরীক্ষা হচ্ছে। যদি ভবনের ফাউন্ডেশন অথবা ভূমি ধসে যাই বা তরলীকরণের ঘটনা ঘটে তাহলে উপরের স্ট্রাকচারও টিকবে না। এখন তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গুলোকে দ্রুত তদন্ত করে যেসব ভবনের অবস্থা মোটামুটি ভালো সেগুলোকে মজবুতকরণ এর কাজ করতে হবে এবং যেগুলোর অবস্থা ভালো না সেগুলো ভেঙে ফেলতে হবে।
চুয়েটে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে মাটি পরীক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, “এখানে এখনো কোনো দৃশ্যমান সমস্যা দেখা যায়নি। বর্তমান স্থাপনা যেগুলো নির্মাণ হচ্ছে সব জায়গায় মাটি পরীক্ষা করা হয়েছে। পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় চুয়েটের এরিয়াতে মাটির অবস্থা এবং ঘনত্বও ভালো।”
চুয়েটের ভূমিকম্প গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “বাংলাদেশ ও দেশের বর্ডার সংলগ্ন এলাকায় মোট ৫ টি ভূমিকম্পের উৎস রয়েছে। এসব উৎস থেকে রিখটার স্কেলে ৭.৫ থেকে ৮.৫ মাত্রার ভূমিকম্প উৎপন্ন হতে পারে। তবে কবে হতে পারে সেটি বলা মুশকিল। চট্টগ্রাম শহরের আর্থকোয়েক ড্যামেজ অ্যাসেসমেন্ট করে দেখা গেছে যে যদি বাংলাদেশ মায়ানমার বর্ডারে ভূমিকম্প হয় তবে চট্টগ্রামের ৪১টি ওয়ার্ডের ২ লক্ষ ৬২ হাজার বিল্ডিং এর মধ্যে প্রায় ২ লক্ষ বিল্ডিং বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এক্ষেত্রে যেগুলো গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেগুলো অ্যাসেসমেন্ট করে যদি তার ভূমিকম্প প্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকে তবে রিপেয়ার এর অযোগ্য হয়ে যাবে । ২০২০ এ নতুন বিএনবিসি অনুসারে চট্টগ্রামের সিসমিক কোএফিশিয়েন্ট ০.২৮ ধরা হয়েছে যেখানে ১৯৯৩ বিল্ডিং কোডে এটি ০.১৫ । তাহলে আগের এসব ভবনে যে ধরনের ডেফিসিয়েন্সি রয়েছে সেগুলো অ্যাসেসমেন্ট করে শক্তি বৃদ্ধি করতে হবে। মেট্রোরেলকে নিরাপদ করার ক্ষেত্রেও পিলার সমূহ অ্যাসেসমেন্ট করতে হবে। অভিজ্ঞ দল গঠন করে সিন্সিয়ারলি কাজ করলে এক সপ্তাহের মধ্যেই এটি সম্ভব।”
ভূমিকম্প প্রতিরোধে চুয়েটের ভবনসমূহ কতটুকু প্রস্তুত এ বিষয়ে তিনি বলেন, ” ভবন যেগুলো পঞ্চাশের বেশি হয়ে গেছে বয়স, সেগুলো অলরেডি শক্তি হারিয়েছে। উপাচার্য স্যারকে আমি চুয়েটের সকল ভবনকে অ্যাসেসমেন্টের প্রস্তাব দিয়েছি। এটি খুব দ্রুত করতে হবে। আমাদের আর্থকোয়েক ইন্সটিটিউটে স্টিলের টেবিল টেস্ট করা হয়েছে, এই মডেল অনুসারে টেবিল তৈরি করে হল গুলোতে দিয়ে দিতে হবে। দুই-তিনতলা থেকে দ্রুত নিচে নামার জন্য ইমার্জেন্সি সিঁড়ি নির্মাণ করে দিতে হবে। এসব বিষয়ে দ্রুত একটি প্রকল্প নিতে বলেছি।”