আসাদুল্লাহ গালিব:
নবম শতাব্দী, ইসলামী সভ্যতার স্বর্ণযুগ। গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসা ও দর্শনের মতো জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় তখন মুসলিম বিশ্বের জয়জয়কার। এই সময়ে বাগদাদ হয়ে ওঠে বিশ্বের প্রধান জ্ঞানকেন্দ্র।
এই শতাব্দীতেই প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। তবে সেটি কেমব্রিজ বা অক্সফোর্ড নয়। ‘আল কারাউইয়িন বিশ্ববিদ্যালয়’, যা গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড এবং ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্বের প্রথম এবং প্রাচীনতম ক্রমাগত চালু থাকা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আর এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন একজন মুসলিম নারী, ফাতিমা আল ফিহরি।
ফাতিমা আল ফিহরি আনুমানিক ৮০০ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান তিউনিসিয়ার কাইরাওয়ান শহরে জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে পরিবারসহ তারা মরক্কোর ফেজ শহরে বসবাস শুরু করেন। তার বাবা মুহাম্মদ আল ফিহরি ছিলেন একজন ধনী ব্যবসায়ী। পিতার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বিশাল সম্পদ ব্যক্তিগত বিলাসিতায় ব্যয় না করে ফাতিমা চাইলেন সমাজ ও ধর্মের কল্যাণে তা উৎসর্গ করতে। সেই সম্পদ ব্যয় করে তিনি ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে মরক্কোর ফেজ শহরে আল কারাউইয়িন মসজিদ এবং সংলগ্ন একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রারম্ভিক ইসলামিক যুগে প্রধান মসজিদগুলো বহুমুখী উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতো। সেখানে ধর্মীয় উপাসনার পাশাপাশি শিক্ষা এবং সামাজিক কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হতো।
সময়ের সাথে সাথে আল-কারাউইয়িন একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, যা মুসলিম বিশ্বের পাশাপাশি মধ্যযুগীয় ইউরোপের পণ্ডিতদেরও আকর্ষণ করে। এখানকার পাঠ্যক্রম ছিল বৈচিত্র্যময় এবং সমৃদ্ধ। ধর্মীয় বিষয় যেমন কোরআনের ব্যাখ্যা (তাফসীর) ও ইসলামি আইনশাস্ত্র (ফিকহ) এর পাশাপাশি বীজগণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, উদ্ভিদবিদ্যা, মানচিত্রবিদ্যা, ভূগোল, ব্যাকরণ, ইতিহাস, যুক্তিবিদ্যা, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং পদার্থবিজ্ঞানের মতো বিষয়ও পড়ানো হতো। পাশাপাশি গ্রিক ও ল্যাটিনসহ বিভিন্ন ভাষার চর্চাও ছিল এই প্রতিষ্ঠানে। একইসাথে এটি সুফিবাদ চর্চারও কেন্দ্র ছিল।
ফাতিমা নিজে এই প্রতিষ্ঠানে ইসলামী আইনশাস্ত্র এবং গণিত অধ্যয়ন করেছিলেন বলে জানা যায়।
ইতিহাসবিদদের মতে, মধ্যযুগে আল-কারাউইয়িন ছিল বৈজ্ঞানিক বিতর্ক ও উচ্চশিক্ষার এক প্রাণকেন্দ্র। পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিকাশেও এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে অক্সফোর্ডসহ ইউরোপীয় কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক পাঠ্যক্রমে আল-কারাউইয়িনের শিক্ষার কাঠামোর সাথে কিছু মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এছাড়াও এটিই ছিল বিশ্বের প্রথম প্রতিষ্ঠান, যেখানে পাঠ্যক্রম শেষে শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা প্রমাণের স্বীকৃতিস্বরূপ ইজাজা বা সনদ প্রদান করা হতো, যেটি আধুনিক ডিগ্রি ব্যবস্থার আদি ধারণার সঙ্গে তুলনীয়।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যুক্ত ছিলেন বহু খ্যাতিমান পণ্ডিত। তাদের মধ্যে মানচিত্রবিদ আল-ইদ্রিসি, চিন্তাবিদ ইবনে রুশদ, ইহুদি দার্শনিক মাইমোনাইডস, জ্যোতির্বিজ্ঞানী আল-বিত্রুজি, এবং ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন উল্লেখযোগ্য।
যখন ইউরোপসহ বিশ্বের অধিকাংশ জনপদে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় নারীরা পিছিয়ে ছিল, ঠিক সেই যুগে একজন মুসলিম নারী একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে বিশ্ব সভ্যতায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। আজকের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, তার আদি ও অকৃত্রিম ভিত্তি রচিত হয়েছিল ফাতিমা আল ফিহরির হাত ধরেই।