সাইকা শুহাদাঃ
সাদামাটা এক শ্রেণিকক্ষ, তার দেয়ালে রং চটে যাওয়া পুরোনো চার্ট, জানালা দিয়ে ঢুকছে বিকেলের ঝিরঝিরে আলো, কোণায় ধুলোমাখা এক কাঠের টেবিল। আর পাশেই উজ্জ্বল চোখে দাঁড়িয়ে আছে কয়েক কিশোর-কিশোরী। তাদের কারো হাতে সোল্ডারিং আয়রন, কারো সামনে সার্কিট বোর্ড আর রঙিন কিছু তার ছড়িয়ে তাতে। কারো মুখে দ্বিধা নেই, বরং একরাশ কৌতূহল—যেন প্রথমবারের মতো তারা বুঝতে শিখছে বিজ্ঞান, বইয়ের বাইরের বাস্তবতায়।
অভিজাত শহুরে বিদ্যালয়ের নয়, বরং চট্টগ্রামের একটি প্রত্যন্ত গ্রামের একটি সাধারণ বিদ্যালয়ে দেখা গেছে এই দৃশ্য। আর এই অস্বাভাবিক সুন্দর দৃশ্যপটের নেপথ্যে রয়েছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) দুই তরুণ শিক্ষার্থী—মো রায়হানুল নাঈম ও জি এম ফয়সাল তাইসির। যাঁরা বিশ্বাস করেন প্রযুক্তি হবে সকলের জন্য, সীমান্ত ছাড়াবে তার আলো। স্বপ্নবাজ এই দুই তরুণ যন্ত্র ও প্রযুক্তির জগতের শিক্ষার্থী হলেও, অন্তরে লালন করেন মানুষ গড়ার প্রকৌশল।
জানা যায়, তাদের এ যাত্রা শুরু হয় গত বছর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের ৫ তারিখ, চট্টগ্রামের সবুজে ঘেরা এক গ্রামে। সেদিন বীজ বোনা হয় এক স্বপ্নের, যা আজ পরিণত হয়েছে সামাজিক দায়বদ্ধতামূলক প্ল্যাটফর্ম- সাইফার এজ (Cypher Edge)। নাইম আর তাইসিরের সাথে যোগ দিয়েছেন আরও ছয়জন শিক্ষার্থী। মোট আট সদস্যের এ প্লাটফর্মের মূলে রয়েছে স্পষ্ট এক লক্ষ্য- রোবটিক্স ও প্রযুক্তি শিক্ষাকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া। এতে কেবল শহরের শিক্ষার্থীরা না, বরং দেশের সর্বস্তরের শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তির আলোয় আলোকিত হতে পারবে।
সাইফার এজ এর মূল কার্যক্রম ও অনুষ্ঠানগুলোর এর মধ্যে আছে রোবোটিক্স কর্মশালা- “Robotics for Everyone”। যেখানে শিক্ষার্থীরা মাইক্রোকন্ট্রোলার, সেন্সর, বোট এবং অটোমেশনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত বিষয় সরাসরি শিখতে পারে। এই কর্মশালায় শিক্ষার্থীরা রোবোটিক্সকে সরাসরি হাতে-কলমে জানতে পেরেছিল। যেখানে তাদের হাতে সরাসরি সরঞ্জাম তুলে দেওয়া হয়, যা তাদের বিজ্ঞানের তত্ত্ব থেকে বাস্তব জীবনের প্রয়োগ বুঝতে সাহায্য করে।
অন্যদিকে, এ সংগঠনের পক্ষ থেকে “Money Can’t Be a Barricade to Education” স্লোগানকে সামনে রেখে একটি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হয়। যেখানে স্বল্পমূল্যে রোবটিক্স সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়। যেন আর্থিক সীমাবদ্ধতা শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো বাঁধা হয়ে না দাঁড়ায়। সাইফার এজ বিশ্বাস করে, প্রযুক্তির জ্ঞান যেকোনো বয়স বা পটভূমির মানুষের জন্য উন্মুক্ত হওয়া উচিত।
এছাড়া, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও স্টার্টআপ টেক অ্যাডভাইজরি কার্যক্রমের মাধ্যমে স্থানীয় শিক্ষকদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন উদ্ভাবন এবং উদ্যোগ শুরু করা স্টার্টআপগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা হয়। এতে শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, শিক্ষকদের মধ্যেও প্রযুক্তির আগ্রহ ও সক্ষমতা বাড়ে, যা সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে সহায়ক।
এছাড়া এ সংগঠনের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম হলো- পাঠ্যবই ভিত্তিক ব্যবহারিক উপকরণ সরবরাহ; যেখানে নিজেদের তৈরি করা সরঞ্জামের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে পাঠ্যবিষয় শেখানো হয়। এই সরঞ্জামগুলো পাঠ্যপুস্তকের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়ায় শিক্ষার্থীরা বইয়ের তত্ত্ব ও প্রয়োগের মাঝে সহজেই সেতুবন্ধন করতে পারে।
জানা যায়, সাইফার এজ কর্মসূচি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDG) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করে। এর মধ্যে বিশেষভাবে তিনটি লক্ষ্যকে গুরুত্ব দেয়া হয়। প্রথমত, এসডিজি-৪; যা মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পিছিয়ে পড়া ও অর্থনৈতিকভাবে সীমাবদ্ধ এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে প্রযুক্তি শিক্ষা প্রদান করে। দ্বিতীয়ত, এসডিজি-১০; এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি করা। আর্থিক সীমাবদ্ধতা আর শিক্ষার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে না, তা নিশ্চিত করা এই লক্ষ্যের মূল ভাবনা। এছাড়াও এসডিজি ৯; এর আওতায় প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করে সাইফার এজ, যা স্থানীয় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও নবীন সংস্থাগুলোকে সহায়তা দিয়ে শিল্পক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়।
“Learning by Doing, Creating by Thinking.” যাকে বাংলায় বলা যায় -“শেখো কাজের মাঝে, গড়ো ভাবনার স্পন্দনে”। এই স্লোগানকে সামনে রেখে সাইফার এজ এর স্বপ্নদ্রষ্টা চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী মো রায়হানুল নাঈম চুয়েটনিউজ২৪কে বলেন,
শৈশবে শুনতাম, জাপানের শিশুরা বাড়িতে বসে রোবট বানায়। আর আমাদের শিশুরা শুধু শোনে ‘রোবট’, ‘কোডিং’, ‘সেন্সর’। কিন্তু সেগুলো ছুঁয়ে দেখার বা জানার সুযোগ পায় না। প্রতিভার অভাব নয়, মূল সমস্যা হলো সুযোগের সীমাবদ্ধতা। প্রযুক্তি শেখা এখনো ব্যয়বহুল ও সীমিত কিছু প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এই বেদনা থেকেই জন্ম সাইফার এজ এর প্রযুক্তি শিক্ষাকে সবার জন্য উন্মুক্ত, বিনামূল্যে ও সহজলভ্য করে তোলার এক প্রয়াস। যেন বাংলাদেশের প্রতিটি শিশু হাতে-কলমে শিখে, স্বপ্ন দেখতে পারে, আর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারে। এটা শুধু শিক্ষা নয়, এটা এক প্রযুক্তিগত আন্দোলন।
আরেক স্বপ্নদ্রষ্টা কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী জি এম ফয়সাল তাইসির জানান, আমরা রোবটিক্স ও প্রযুক্তি শিক্ষাকে সবার দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে চাই। এখন দেখা যাচ্ছে, যারা এ ক্ষেত্রে কাজ করছে, তারা মূলত বড় বড় বা ইংরেজী মাধ্যম বিদ্যালয়গুলোকে কেন্দ্র করে কাজ করছে। কিন্তু আমরা সেটা চাই না। আমাদের লক্ষ্য হলো- দেশের যেকোনো প্রান্তের শিক্ষার্থী যেন সহজভাবে এই জ্ঞান অর্জন করতে পারে। আমরা বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত থাকতে হলে প্রযুক্তি শিক্ষায় সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
উল্লেখ্য, এখন পর্যন্ত ডিসেম্বর ২০২৪ থেকে মে ২০২৫ পর্যন্ত সাইফার এজ সফলভাবে ৭টি বিদ্যালয়ে রোবটিক্স বিষয়ক কর্মশালা আয়োজন করেছে। এই কর্মশালাগুলোতে অংশগ্রহণ করেছেন শতাধিক শিক্ষার্থী, যারা তাদের প্রযুক্তি শিক্ষার পথচলায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছেন বলে জানা যায়। এছাড়া স্বল্পমূল্যে রোবটিক্স সরন্জাম বিতরণ করা হয়েছে, যা অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষভাবে সহায়ক। স্থানীয় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও নতুন উদ্যােগগুলোর প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করাও সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে।