দুই দশকের স্মৃতি এক মলাটে, প্রকাশিত হলো বৃহত্তর নোয়াখালী স্টুডেন্ট ফোরামের স্মারক ম্যাগাজিন ‘দর্পণ’

জারীন তাসমীন সাবা

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) ভর্তি হতে এসে অনেক শিক্ষার্থীকেই প্রথমবারের মতো পরিবার ছেড়ে নতুন শহরে মানিয়ে নিতে হয়। অচেনা ক্যাম্পাস, নতুন পরিবেশ, পড়াশোনার চাপ—সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শুরুটা অনেকের জন্যই চ্যালেঞ্জের। তবে এই পথচলাকে সহজ করে দিতে কিছু সংগঠন নীরবে কাজ করে যায় বছরের পর বছর। চুয়েটের গ্রেটার নোয়াখালী স্টুডেন্ট ফোরাম (জিএনএসএফ) তেমনই একটি সংগঠন, যা শুধু একটি আঞ্চলিক ছাত্রসংগঠন নয়; বরং হাজারো শিক্ষার্থীর কাছে একটি বড় পরিবারের নাম।

প্রায় দুই দশক আগে যাত্রা শুরু করা এই সংগঠন আজ নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর জেলার শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক শক্তিশালী বন্ধনের সেতুবন্ধন তৈরি করেছে। নতুন শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে অ্যালামনাইদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড আয়োজন—সবকিছু মিলিয়ে জিএনএসএফ এখন চুয়েটের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ছাত্রসংগঠন।

আর সেই দীর্ঘ পথচলা, অসংখ্য মানুষের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা, ভালোবাসা এবং শেকড়ের টান এবার ধরা পড়েছে একটি মলাটে। সংগঠনটির ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছে বিশেষ স্মারক ম্যাগাজিন ‘দর্পণ’।

ম্যাগাজিনটিতে স্থান পেয়েছে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং দেশ-বিদেশে কর্মরত অ্যালামনাইদের স্মৃতিচারণ, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি, ইতিহাসভিত্তিক নিবন্ধ ও সাহিত্যকর্ম। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি এতে উঠে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বন্ধুত্ব, নেতৃত্ব, সংগ্রাম, আঞ্চলিক পরিচয়ের বন্ধন এবং শেকড়ের প্রতি দায়বদ্ধতার নানা অনুষঙ্গ।

​শিকড়ের টান থেকে সংগঠনের জন্ম

চুয়েটে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা এলেও নিজের জেলার মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়ার অনুভূতি সবসময়ই আলাদা। সেই অনুভূতিকে আরও সংগঠিত ও অর্থবহ করে তুলতেই ২০০৬ সালে কয়েকজন দূরদর্শী শিক্ষার্থীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় গ্রেটার নোয়াখালী স্টুডেন্ট ফোরাম।

ম্যাগাজিনের শুভেচ্ছা বার্তায় সংগঠনের প্রাক্তন সভাপতি আদনান সামি সরকার লিখেছেন, চুয়েটে নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর থেকে আসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তোলাই ছিল এই সংগঠনের মূল লক্ষ্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি একটি শক্তিশালী অ্যালামনাই নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, দুই দশকের পুরোনো এই সংগঠনের নেতৃত্ব দেওয়া যেমন গর্বের, তেমনি দায়িত্বেরও। বর্তমান কমিটির অন্যতম লক্ষ্য ছিল অ্যালামনাইদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করা। সেই উদ্দেশ্যে বিশিষ্ট অ্যালামনাইদের নিয়ে বিশেষ ফিচার প্রকাশ, তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য পেশাগত নেটওয়ার্ক তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভর্তি সংবর্ধনা ও বার্ষিক বারবিকিউসহ বিভিন্ন আয়োজনে সদস্যদের অংশগ্রহণ আরও সহজ করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম খলিল আবির তাঁর লেখায় বলেন, “জিএনএসএফ কেবল একটি সামাজিক সংগঠন নয়, এটি বৃহত্তর নোয়াখালীর শিক্ষার্থীদের ঐক্য, সৌহার্দ্য ও শেকড়ের বন্ধনের প্রতীক।” তাঁর মতে, ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত এই ম্যাগাজিন সংগঠনের অর্জন, অঙ্গীকার ও উত্তরাধিকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা।

অন্যদিকে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার সাহিদুজ্জামান কিরণ এই প্রকাশনাকে স্বাগত জানিয়ে লিখেছেন, চুয়েটের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এই ফোরাম ভবিষ্যতেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করবে।

ইতিহাস, স্মৃতি ও উত্তরাধিকারের দলিল

ম্যাগাজিনটির অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এটি শুধু বর্তমানের গল্প নয়; বরং সংগঠনটির জন্ম ও বিকাশের ইতিহাসও ধারণ করেছে। প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের লেখায় উঠে এসেছে ২০০৬ সালে কয়েকজন শিক্ষার্থীর উদ্যোগে জিএনএসএফ প্রতিষ্ঠার গল্প, সীমিত পরিসরের কার্যক্রম থেকে ধীরে ধীরে চুয়েটের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী আঞ্চলিক ছাত্রসংগঠনে পরিণত হওয়ার দীর্ঘ পথচলা এবং সেই যাত্রার নেপথ্যের মানুষদের অবদান।

ফলে নতুন প্রজন্ম যেমন সংগঠনের শেকড় সম্পর্কে জানতে পারবে, তেমনি সাবেক সদস্যদের জন্যও এটি হয়ে উঠবে স্মৃতির এক আবেগঘন ভাণ্ডার।

শিক্ষক থেকে অ্যালামনাই—সবার গল্প একসঙ্গে

সংগঠনের সঙ্গে দীর্ঘদিন সম্পৃক্ত শিক্ষকদের লেখাও ম্যাগাজিনে বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে।

যন্ত্রকৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রেদোয় মাসুম মেরাজ তাঁর লেখায় বিশ্ববিদ্যালয়জীবন, সংগঠনের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা এবং একজন শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি আঞ্চলিক সংগঠন শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্ব, দায়িত্ববোধ এবং দলগত কাজের মানসিকতা গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখে।

একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল-মামুন লিখেছেন নতুন শহরে এসে সিনিয়রদের সহযোগিতা, পারিবারিক বন্ধনের অনুভূতি এবং একজন শিক্ষার্থীর বিকাশে আঞ্চলিক সংগঠনের ভূমিকা নিয়ে। তাঁর লেখায় উঠে এসেছে সেইসব মানুষের গল্প, যারা পরিবার থেকে দূরে থেকেও অন্যদের মধ্যে পরিবারের উষ্ণতা খুঁজে পেয়েছেন।

ম্যাগাজিনের অন্যতম আকর্ষণ ‘অ্যালামনাই রিফ্লেকশনস’ বিভাগ। বিভিন্ন প্রজন্মের অ্যালামনাইরা ফিরে গেছেন তাঁদের চুয়েট জীবনের স্মৃতিময় দিনগুলোতে। আশির দশকের শিক্ষার্থী শওকত মহিবুর রব হলজীবনের প্রাণবন্ত ঘটনা, বন্ধুত্ব ও ক্যাম্পাস সংস্কৃতির স্মৃতি তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে জুনুদ হোসেন চৌধুরী স্মরণ করেছেন তাঁদের সময়ের পারস্পরিক সহযোগিতা, সহাবস্থান এবং আজও অটুট থাকা সম্পর্কের কথা। ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে তাঁদের লেখায় ফুটে উঠেছে চুয়েটের একেকটি সময়ের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

ইতিহাস, সাহিত্য ও ভ্রমণের সংমিশ্রণ

সাহিত্য ও স্মৃতিচারণের পাশাপাশি ম্যাগাজিনে স্থান পেয়েছে বৃহত্তর নোয়াখালীর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সম্ভাবনাকে ঘিরে তথ্যসমৃদ্ধ নিবন্ধ। নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর জেলার পরিচিতি, ইতিহাস ও সামাজিক-অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে রয়েছে পৃথক লেখা। পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চল হাতিয়ার উন্নয়ন, সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় এবং সমাজ-সংস্কৃতিভিত্তিক নিবন্ধও স্থান পেয়েছে এই প্রকাশনায়।

ভ্রমণপ্রিয় পাঠকদের জন্য রয়েছে নেপাল ভ্রমণের অভিজ্ঞতাভিত্তিক একটি বর্ণনামূলক লেখা। সেখানে ব্যক্তিগত অনুভূতি, ভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় এবং হিমালয়ের প্রকৃতির সৌন্দর্য জীবন্ত বর্ণনায় উঠে এসেছে।

এ ছাড়া কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, স্মৃতিচারণ ও সৃজনশীল লেখায় সমৃদ্ধ হয়েছে ম্যাগাজিনটির সাহিত্য অংশ, যা প্রকাশনাটিকে কেবল একটি স্মারক নয়, বরং একটি বহুমাত্রিক সাহিত্য ও ইতিহাসের সংকলনে পরিণত করেছে।

সংরক্ষণ করার মতো এক স্মারক

প্রকাশনার নান্দনিক বিন্যাসও বিশেষভাবে দৃষ্টি কাড়ে। জলরঙের অলংকরণ, পরিচ্ছন্ন নকশা, পুরোনো আলোকচিত্র, বিভিন্ন সময়ের কার্যক্রমের ছবি এবং স্মৃতিময় ক্যাপশন ম্যাগাজিনটিকে শুধু পড়ার নয়, সংরক্ষণ করার মতো একটি স্মারকগ্রন্থে পরিণত করেছে।

দুই দশকের ইতিহাস, অসংখ্য মানুষের স্মৃতি, সাফল্য, সংগ্রাম ও ভালোবাসার গল্প ধারণ করে ‘দর্পণ’ হয়ে উঠেছে বৃহত্তর নোয়াখালী স্টুডেন্ট ফোরামের একটি প্রজন্মান্তরের দলিল। নতুনদের জন্য এটি যেমন পরিচয়ের জানালা, তেমনি পুরোনোদের জন্য ফিরে দেখার এক আবেগময় আয়না।