চুয়েটে আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় শিরোপা জিতল প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়

ইবাদ হোসেন:-

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) বিতর্ক সংগঠন চুয়েট ডিবেটিং সোসাইটির (চুয়েটডিএস) আয়োজনে দুই দিনব্যাপী ‘আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক উৎসব-২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত শুক্রবার (১০ জুলাই) শুরু হওয়া দুইদিনব্যাপী এ প্রতিযোগিতায় দেশের ২৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতার্কিক দল অংশ নেয়। বাংলা এশিয়ান পার্লামেন্টারি ফরম্যাটে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের যুক্তিবোধ, বিশ্লেষণী দক্ষতা, মুক্তচিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে উৎসাহিত করা।

শনিবার (১১ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে প্রতিযোগিতাটির চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। শিরোপার লড়াইয়ে মুখোমুখি হয় প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটি এবং ডিবেটার্স অব চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটি। চূড়ান্ত পর্বে ‘এই সংসদ মনে করে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রাপ্ত মুনাফার সিংহভাগ চট্টগ্রামের সমস্যার সমাধানে ব্যয় হওয়া উচিত’—এই প্রস্তাবে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সরকারি দলের ভূমিকায় থাকা প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় বিজয়ী হয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। রানার্সআপ হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দল।

চূড়ান্ত পর্বের বিতর্কে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের মোবারক হোসেন সজীব সেরা বিতার্কিক নির্বাচিত হন। পুরো প্রতিযোগিতার শ্রেষ্ঠ বিতার্কিকের পুরস্কার যৌথভাবে অর্জন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকরামুল হোসেন এবং প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের তন্ময় তাহসিন।

সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চুয়েট ডিবেটিং সোসাইটির মডারেটর ও স্থাপত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সজীব পাল, ক্লাবের মডারেটর ও মানবিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাহিদা সুলতানা, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. ফৌজিয়া গুলশানা রশিদ লোপা, বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সাইফুদ্দিন মুন্না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির সাবেক সহ-সভাপতি সোহানুর রহমান সোহান এবং চুয়েট ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি কামরুল আহসান মাহির। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী আদিল রায়হান।

আমন্ত্রিত অতিথির বক্তব্যে চুয়েট ডিবেটিং সোসাইটির মডারেটর ও মানবিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাহিদা সুলতানা বলেন, “বৈরি আবহাওয়ার মধ্যেও অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ায় সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য দোয়া করবেন এবং তাদের পাশে থাকবেন। বিতর্ক আমাদের একে অপরের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে, ভিন্ন মত গ্রহণ করতে এবং যুক্তির মাধ্যমে নিজের মতামত উপস্থাপন করতে শেখায়। যারা আজ জয়ী হতে পারোনি, তারা হতাশ হবে না। লিওনেল মেসির মতো বারবার ফিরে এসে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করবে। আগামী মাসে আমি উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে বিদেশে যাচ্ছি। তবে যেখানেই থাকি না কেন, চুয়েট ডিবেটিং সোসাইটির প্রতি আমার শুভকামনা ও সমর্থন সবসময় থাকবে।”

স্থাপত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সজীব পাল বলেন, “প্রকৃতি আজ আমাদের এই অনুষ্ঠানে সহায়তা না করলেও চুয়েট ডিবেটিং সোসাইটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে আয়োজনটি সম্পন্ন করেছে। এজন্য আমি চুয়েট ডিএসকে ধন্যবাদ জানাই। আজকের প্রতিযোগিতায় বিজয়ী ও বিজিত—উভয় দলকেই আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই। অনিবার্য কারণে আজ উপাচার্য স্যার অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি। তিনি আমাদের এই অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছেন। আশা করি, ভবিষ্যতেও আমরা স্যারকে সবসময় পাশে পাব।”

বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সাইফুদ্দিন মুন্না বলেন, “চুয়েট ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি কামরুল প্রায় দুই মাস ধরে এই আয়োজন সফল করতে আমার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছেন। আমি সিটি কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় ২০০৭ সালে প্রথম চুয়েটে এসেছিলাম এবং ২০১২ সাল পর্যন্ত নিয়মিত বিতর্ক করেছি। চুয়েট ডিবেটিং সোসাইটি দীর্ঘদিন ধরে গৌরবের সঙ্গে পথচলা অব্যাহত রেখেছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় চট্টগ্রামের দলগুলো ধারাবাহিকভাবে ভালো করছে। আমি বিশ্বাস করি, এই প্রতিযোগিতা থেকে তোমরা যে অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা অর্জন করেছ, তা ভবিষ্যতে ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে কাজে লাগবে।”

চুয়েট ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি কামরুল আহসান বলেন, “আজ হয়তো সভাপতি হিসেবে আমার শেষ বক্তব্য, তাই কিছুটা আবেগাপ্লুত লাগছে। শেষ মুহূর্তে প্রতিযোগিতার সূচি পরিবর্তন করতে হলেও সবাই যেভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহযোগিতা করেছেন, তার জন্য আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। এবারের আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক উৎসবে দেশের ২৬টি বিশ্ববিদ্যালয় অংশ নিয়েছে, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের। আমরা ‘তারুণ্যের উৎসব’ নামে আমাদের সিগনেচার আয়োজনটি করার পরিকল্পনা করেছিলাম, কিন্তু বৈরি আবহাওয়ার কারণে তা সম্ভব হয়নি। ভবিষ্যতের আয়োজনগুলোতেও সবাইকে পাশে থাকার এবং অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।”

আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতার পাশাপাশি এদিন আন্তঃহল বিতর্ক প্রতিযোগিতা-২০২৫-এর ফাইনালও অনুষ্ঠিত হয়। ‘এই সংসদ লক্ষ্য পূরণের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগকে প্রাধান্য দেবে না’—এই প্রস্তাবে অনুষ্ঠিত ফাইনালে শহীদ মোহাম্মদ শাহ হল বিরোধী দল হিসেবে চ্যাম্পিয়ন এবং কবি কাজী নজরুল ইসলাম হল সরকারি দল হিসেবে রানার্সআপ হয়। এতে আব্দুল্লাহ আবির সেরা বিতার্কিক এবং পুরো প্রতিযোগিতায় কৌশিক কাব্য শ্রেষ্ঠ বিতার্কিক নির্বাচিত হন।

এছাড়া, সমাপনী অনুষ্ঠানে ‘শেকড়—অকশন বিতর্ক প্রতিযোগিতা-২০২৬’-এর বিজয়ীদের হাতেও পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।