আড্ডারু গল্পবাজ ২০২৬: কলম ও ক্যামেরার চোখে মুক্তিযুদ্ধ

নাজিফা তাসনিম জিফা:

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) এর ডিবেটিং সোসাইটির উদ্যোগে প্রকাশিত ম্যাগাজিন “আড্ডারু গল্পবাজ ২০২৬” এবার ফিরে তাকিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের এক কম আলোচিত অধ্যায়ে। বিতর্কচর্চার পাশাপাশি চিন্তা ও সৃজনশীল প্রকাশের ধারাবাহিকতায় প্রকাশিত এই সংখ্যাটি উৎসর্গ করা হয়েছে সেইসব সাংবাদিক ও আলোকচিত্রীদের প্রতি, যাঁরা ১৯৭১ সালে অস্ত্র নয়, কলম আর ক্যামেরা হাতে নিয়ে সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। ইতিহাসের পরিচিত বীরত্বের গল্পের বাইরে গিয়ে এই ম্যাগাজিন তুলে ধরতে চেয়েছে নীরব সাক্ষীদের কথা, যাঁদের অবদান ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের দলিল অসম্পূর্ণ।

ম্যাগাজিনের শুরুতেই পাঠক পৌঁছে যান সাংবাদিকতা ও সংগ্রামের আলোচনায়। এখানে দেখানো হয়েছে, সাংবাদিকতা কেবল পেশা নয়, সংকটের সময় এটি হয়ে ওঠে নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর। মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক আন্দোলন পর্যন্ত, কীভাবে সাংবাদিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্য সামনে এনেছেন, তার ধারাবাহিক চিত্র উঠে এসেছে এই অংশে।

এর পরের অংশ “ফ্রেমে বন্দী একাত্তর” পাঠককে নিয়ে যায় আলোকচিত্রের জগতে। আলোকচিত্রের শক্তি নিয়ে লেখা এই অংশে উঠে এসেছে জহির রায়হানের প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’, যা মাত্র বিশ মিনিটে বিশ্ববিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। রশীদ তালুকদারের তোলা রায়েরবাজার বধ্যভূমির ছবি, আনোয়ার হোসেনের ক্যামেরায় ধরা পড়া ‘রাইফেল হাতে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা’ কিংবা কিশোর পারেখের ‘বাংলাদেশ: এ ব্রুটাল বার্থ’, এই সব চিত্র একাত্তরের ইতিহাসকে স্থির ফ্রেমে বন্দী করে রেখেছে।

“একজন সাক্ষী, যিনি চুপ করেননি” অংশের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন এন্থনি মাসকারেনহাস। তাঁর লেখা ‘জেনোসাইড’ কীভাবে বিশ্ববিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল এবং কীভাবে একজন বিদেশি সাংবাদিক নৈতিক অবস্থান থেকে ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছিলেন, এই অধ্যায় তা সহজ ও সংবেদনশীল ভাষায় তুলে ধরেছে।

ম্যাগাজিনের পরের অংশগুলো আরও গভীরে নিয়ে যায় পাঠককে। “রণদিনলিপি” অধ্যায়ে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে যুদ্ধকালীন বাস্তবতা ধরা পড়েছে। চট্টগ্রামের ইতিহাসও এই সংখ্যায় আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে। উনসত্তরপাড়া, পাহাড়তলী, কালুরঘাট, পতেঙ্গা, দেওয়ানহাট ও ফয়েজ লেক – এই বধ্যভূমিগুলোর ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে স্থানীয় স্মৃতি, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা ও তথ্যভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে। এই অংশগুলো পাঠককে মনে করিয়ে দেয়, অনেক ইতিহাস আজও আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে।

এর পাশাপাশি বীর বিক্রম জগৎজ্যোতি দাসের গল্প, কবিতা ও সৃজনশীল লেখাগুলো ম্যাগাজিনটিকে শুধু তথ্যভিত্তিক নয়, অনুভবের জায়গায়ও পৌঁছে দিয়েছে। এগুলো প্রশ্ন তোলে, আমরা কি এই ইতিহাস মনে রাখছি? আমরা কি জানাচ্ছি পরবর্তী প্রজন্মকে?

“আড্ডারু গল্পবাজ ২০২৬” তাই কেবল একটি ম্যাগাজিন নয়। এটি একটি স্মৃতিচারণ, একটি দায়িত্ববোধের প্রকাশ। যারা সামনে থেকে যুদ্ধ করেননি, কিন্তু সত্যকে বাঁচিয়ে রাখতে জীবন বাজি রেখেছিলেন, এই প্রকাশনা তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতার দলিল।

এই পুরো সংখ্যাটির পেছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রস্তুতি ও সম্মিলিত শ্রম। গবেষণা, লেখা, সম্পাদনা, গ্রাফিক ডিজাইন, সব মিলিয়ে চুয়েট ডিবেটিং সোসাইটি ‘মিছিল’ টিমের সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রম স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। সহযোগী হিসেবে চুয়েট সাংবাদিক সমিতি এবং চুয়েট ফটোগ্রাফিক সোসাইটি ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

ম্যাগাজিনটির প্রধান সম্পাদক এবং চুয়েট ডিবেটিং সোসাইটি ‘মিছিল’ টিমের সহ-সভাপতি মাদিহা আহমেদ চৌধুরী বলেন, “সাংবাদিক ও আলোকচিত্রীদের নিয়ে যেহেতু এই সংখ্যা, তাদের ছাড়া এই প্রকাশনা হয়তো অসম্পূর্ণ থেকে যেত। আমাদের অনুরোধমাত্র আমাদের ডাকে সাড়া দেওয়ায় তাই অশেষ ধন্যবাদ চুয়েট সাংবাদিক সমিতি ও চুয়েট ফটোগ্রাফিক সোসাইটিকে।”
তিনি আরও জানান, “মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য পরিচিত বীরত্বগাথার আড়ালে থেকে যাঁরা কলম ও ক্যামেরার মাধ্যমে নির্যাতন, গণহত্যা এবং বাঙালির প্রতিরোধের সত্য তুলে ধরেছিলেন, এই সংখ্যা মূলত তাঁদেরই প্রতি উৎসর্গ, কারণ তাঁদের কাজ প্রমাণ করে, মুক্তিযুদ্ধ শুধু অস্ত্রের লড়াই নয়, ছিল তথ্য, সত্য এবং বিবেকের লড়াইও।”

“আড্ডারু গল্পবাজ ২০২৬” ইতিহাসের পরিচিত বর্ণনার বাইরে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে দেখার আরেকটি দরজা খুলে দিয়েছে। সাংবাদিক ও আলোকচিত্রীদের ভূমিকার মধ্য দিয়ে এই সংখ্যা মনে করিয়ে দিয়েছে, সত্যকে ধরে রাখাও এক ধরনের লড়াই। স্মৃতি, নথি ও দৃশ্যের সমন্বয়ে তৈরি এই ম্যাগাজিন কেবল অতীতের দিকে ফিরে তাকায় নি, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের পাঠকের কাছেও দায়িত্ববোধের প্রশ্ন তুলে ধরেছে।