ফাইয়াজ মুহাম্মদ কৌশিকঃ
প্রতিদিনের মতো একটি সকাল, অথচ তার বুকে লুকিয়ে ছিল অসাধারণ কিছু ঘটার প্রতিশ্রুতি। গাছেরা যেন একটু বেশি সবুজ, বাতাসে যেন অন্যরকম এক উত্তেজনা। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে ছিল নতুন চিন্তার স্পর্শ। কল্পনার আকাশে ভেসে বেড়ানো ভাবনাগুলো আজ পা রাখলো মাটিতে—TEDxCUET 2025 হয়ে উঠলো সেই মিলনমঞ্চ, যেখানে বিজ্ঞান, স্বপ্ন আর বাস্তবতা হাত মিলিয়েছে।
২৮ শে জুন, একটা অডিটোরিয়াম, কিছু তরুণ চোখ, আর বুকভরা স্বপ্ন- দিনটা শুরু হয়েছিল এভাবেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে যখন শিক্ষার্থীরা প্রবেশ করছিলেন, তখন মঞ্চে প্রস্তুত হচ্ছিলো সময় বদলে দেওয়ার গল্পগুলো। চোখে পড়ছিলো লাল-সাদা TEDx লোগো, সুশৃঙ্খল চেয়ার, আর স্বেচ্ছাসেবীদের কর্মব্যস্ততা। কিন্তু এসব দৃশ্যের বাইরেও কানে কানে ফিরছিলো একটাই প্রশ্ন—“আজ কার কথা আমাদের ছুঁয়ে যাবে সবচেয়ে বেশি?”
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় সকাল ১০টায়। প্রথম বক্তা হিসেবে মঞ্চে আসেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. সালেহ আহমেদ নকিব। কেবল বক্তব্য নয়—তিনি যেন শ্রোতাদের নিয়ে গেলেন সময় ও মহাকাশের গভীরে। পানি নিয়ে তাঁর ব্যাখ্যায় উঠে আসে জীবনের মৌলিকতা। তিনি বললেন, “পানি কেবল প্রয়োজন নয়, এটি একটি বৈজ্ঞানিক বিস্ময়, একটি জীবনগাথার অংশ।”
প্রযুক্তি মানেই কেবল মেশিন নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ রচনার হাতিয়ার। অনুষ্ঠানে আগত বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান বলেন, “ড্রোন ও নিচু কক্ষপথ উপগ্রহ ভবিষ্যতের কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও গ্রামীণ উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।” তিনি শিক্ষার্থীদের গবেষণা ও উদ্ভাবনের পথে হাঁটার আহ্বান জানান। নতুন উদ্যোক্তা তৈরির তাগিদ দেন, যারা দেশের সমস্যার সমাধান খুঁজবে প্রযুক্তি দিয়ে।
ইট-পাথরের শহরকে টেকসই করে গড়ে তুলতে হলে দরকার অনুভব আর দায়িত্ববোধ। আর কথাকেই কেন্দ্র করে আগত র্যানকন গ্রুপের সিইও তানভীর শাহরিয়ার রিমন বলেন, “রিয়েল এস্টেট শুধু দালান বানানোর শিল্প নয়, এটি ভবিষ্যৎ বানানোর দায়িত্ব।” তিনি তুলে ধরেন তাঁদের পরিবেশবান্ধব প্রকল্প ‘মেমোরি ৭১’-এর কথা, যেখানে ব্যবহৃত হয়েছে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা, বায়ুযোজিত কংক্রিট এবং সবুজ দেয়াল।
ভয়াবহ দূর্যোগ সমূহের একটি হলো ভূমিকম্প। এটা হয় এক মুহূর্তে, কিন্তু প্রস্তুতি তৈরি হয় বছরজুড়ে। এ নিয়ে সাবেক চুয়েট ও রুয়েটের সাবেক উপাচার্য, বর্তমানে চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “ভূমিকম্পে প্রাণহানি ঘটে দুর্বল নির্মাণ আর অজ্ঞতার কারণে, ভূমিকম্পের কারণে নয়।” তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও পশুর আচরণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার ‘Shake Alert’ প্রযুক্তির কথা বলেন। সচেতনতা আর গবেষণার সমন্বয়ে তিনি বিপর্যয় ঠেকানোর আহ্বান জানান।
একটি মঞ্চে একত্রিত হয় যখন বিজ্ঞান, সৃজনশীলতা আর মানবিকতা—তখনই তৈরি হয় সত্যিকারের প্রেরণা। অতিথি ড. আদনান মান্নান, যিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক, জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের ভবিষ্যৎ গড়ার কথা বলেন। মহাকাশ আলোকচিত্রী জুবায়ের কাউলিন মহাশূন্যের নিঃসঙ্গ অথচ শ্বাসরুদ্ধকর সৌন্দর্য তুলে ধরেন ছবি আর কথায়। পুষ্টিবিদ মোহাম্মদ সজল সুষম খাদ্য ও সুস্থ জীবনের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন সহজ ও মানবিক ভাষায়। বসুন্ধরা কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির প্রকল্প প্রধান জাকারিয়া জালাল শিল্পের মাঝে পরিবেশের ভারসাম্য রাখার কৌশল নিয়ে কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে আগত ওবায়দুল্লাহ মোহাম্মদ আফজাল, চুয়েটের কম্পিউটার ও বিজ্ঞান কৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ও আয়োজক দলের অন্যতম সদস্য বলেন, “TEDxCUET আয়োজন করতে পেরে আমরা গর্বিত। এই প্ল্যাটফর্ম থেকে যে আলো ছড়িয়েছে, তা আমাদের ভাবনায়, স্বপ্নে এবং কাজে জ্বালানি দেবে অনেকদিন।”
টেড এক্স শুধুই একগুচ্ছ বক্তৃতা নয়। এটি এক ধরনের বিপ্লব, যা মানুষকে ভাবায়, প্রশ্ন তোলে, আবার উত্তরও দেয়। TEDxCUET 2025 সেই স্ফুলিঙ্গ, যা শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়—একটি প্রজন্মের নতুন যাত্রা শুরু করেছে।
আর সর্বোপরি, চুয়েটের এই আয়োজন প্রমাণ করে, প্রযুক্তি আর পড়াশোনার গণ্ডি পেরিয়ে তরুণরা এখন ভাবতে শিখেছে—কীভাবে তারা হবে আগামী দিনের পরিবর্তনের নায়ক।