ফের সমালোচনায় টিএসসি ক্যাফেটেরিয়া; মিলেছে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ

আসাদুল্লাহ গালিব:

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) ক্যাফেটেরিয়া নিয়ে যেন সমালোচনা যেন থামছেই না । প্রায়শই খাবারের মান, দাম এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিয়ে উঠছে অভিযোগ, প্রমাণও মিলছে এসবের। এবার নতুন করে এর সাথে যুক্ত হয়েছে কর্মচারীদের বেতন বৈষম্যের অভিযোগ। জানা গেছে, এই কারণ দেখিয়ে সম্প্রতি চাকরী ছেড়েছেন প্রায় অর্ধেক পুরাতন কর্মচারী।

এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে মোহাম্মদ আলী এবং ইমন নামে সাবেক দুইজন কর্মচারীর সাথে যোগাযোগ করে চুয়েটনিউজ২৪ । বেতন বৈষম্যের অভিযোগের পাশাপাশি বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছেন তারা।

বেতন বৈষম্যের বিষয়ে মোহাম্মদ আলী বলেন, “সময়মতো আমাদের বেতন না দেওয়ায় আমরা কয়েকজন কর্মচারী চাকরী ছেড়ে দিয়েছি। সেদিন আমরা ডিউটিতে না নামাই ৩০ দিনের বেতন দিয়েছে। এখনো আমাদের ১৫-১৬ জন কর্মচারীর ১১ দিনের মতো বেতন বাকি আছে। এছাড়াও আমাদের সাথে খুব খারাপ আচরণ করা হয়। কর্মচারীর সাথে যদি খারাপ আচরণ করে তবে সে কিভাবে চাকরি করবে সেখানে।”

পাশাপাশি পাওয়া যায় গুরুতর আরো অভিযোগ। এ বিষয়ে আরেক কর্মচারী ইমন বলেন, “খাবারগুলো কোন পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে তৈরি করা হয়না। রাতে থেকে যাওয়া খাবার পরের দিন গরম করে খাওয়ানো হয়। একই তেলে সিঙ্গারা, সমুচা, মুরগি, মাছ, তেহেরির মাংস, ডিম, বার্গারের কাবাব সবকিছু তৈরি করার পরে ওই তেলটা পুনরায় ব্যবহার করা হয়। সকালের জন্য ডাল, ভাজি, তেহারিসহ যেসব খাবারগুলা রাতে প্রস্তুত করে সেগুলো খোলা অবস্থায় রেখে দেয়। স্যান্ডউইচ তৈরিতে ব্যবহৃত মাংসের মান নেই এবং ওই মাংসটার গন্ধ নিলে সেটি খাওয়ার রুচি কারো হতো না। মাংস সিদ্ধ করে এভাবে ফ্রিজে সংরক্ষণ করে এবং পরের দিন গরম করার পর বাজে গন্ধ বের হয়।”

খাবারের দাম কতটা সঙ্গত এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান , “খাবার বানানোর জন্য যতটুকু উপকরণ লাগে তা দেওয়া হয় না। বলা হয়-“যা পাইছো তাই দিয়ে বানাও।” আমার দায়িত্ব ছিলো চা বানানোর। চা এর দাম ১৫ টাকা হিসাবে দুধের ঘনত্ব ঠিক রাখার জন্য ৮ লিটার পানি ব্যবহার করার কথা কিন্তু এখানে আমাকে ১২ লিটার পানি মেশাতে বলা হতো। চায়ের স্বাদের আনার জন্য যেসব মসলা লাগতো সেগুলোও দেয় না। সবকিছু মিলিয়ে খরচ পড়ে ৫ বা ৬ টাকা কিন্তু এটা ১৫ টাকায় বিক্রি করা হয়। দৈনিক এত পরিমাণ সেল হওয়ার পরেও খাবারের কোয়ালিটিটা খুব বাজে থাকে। এর আসল দায় ম্যানেজমেন্টের, আমরা তো উপকরণ ছাড়া ভালো খাবার বানাতে পারি না।”

এসব অভিযোগের বিষয়ে টিএসসি ক্যাফেটেরিয়া পরিচালনারত কস্তুরী রেস্তোরাঁর মালিকের সাথে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। তবে উক্ত ক্যাফেটেরিয়ার ব্যবস্থাপক মো: খাইরুল হোসেন (লিটন) এ ব্যাপারে জানান, “সত্যিকথা বলতে মধ্যেখানে বেতন নিয়ে একটু সমস্যা হয়েছিল। তবে এখন তা ঠিক করা হচ্ছে। আর আমি যতদিন আছি কোনো ভেজাল করতে দিব না এবং আমি মিথ্যার আশ্রয় নিব না। যাই হয় আপনাদের শিক্ষার্থীদের জানাব।”

ক্যাফেটেরিয়া এর এমন নাজুক অবস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রকল্যাণ দপ্তরের পরিচালক মো: মাহবুবুল আলম বলেন, ” কর্মচারীদের ধর্মঘটে যাওয়ার ব্যাপারটা জানার সাথে সাথেই এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ওই দিনেই রাত ১১ টার মধ্যে তাদের বেতন দেওয়া হয়েছে । রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষকে বলেছি কেন তারা বেতন পরে দিবে । ১১ দিনের বেতন তারা পাইনি, এটি নিয়েও আমরা কর্তৃপক্ষকে বলেছি যে এখানে এসব করা যাবে না । এরপরেও যদি এরকম কিছু করে তাহলে আমরা অন্য ব্যবস্থা নিব।

তিনি আরো বলেন, “জিনিসপত্র ভেজালের বিষয় তো কাঙ্ক্ষিত নয়। আমরা জানতে পারলে এগুলা ব্যবস্থা নিব। ভালো কিছুর আশায় আমরা এ পর্যন্ত অনেককেই পরিবর্তন করেছি। কিন্তু উনাদের উপর আমরা এখনো সন্তুষ্ট নই। ক্যাফেটেরিয়া ঠিকমতো চালানোর জন্য সম্প্রতি আমরা একজন শিক্ষককে উপ-পরিচালক হিসেবেও নিযুক্ত করেছি।”

টিএসসি ক্যাফেটেরিয়ার দায়িত্বে নবনিযুক্ত ছাত্রকল্যাণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো: মাসুম রানা প্রামাণিকের সাথে কথা বললে তিনি জানান, “এসব অভিযোগ জানা মাত্রই আমরা মালিককে ডাকিয়ে এনে এসব ঠিক করতে বলি ও সময় বেধে দিই। তিনি প্রয়োজনমত নতুন কর্মচারী নিযুক্ত করেছেন এবং মান ঠিক রাখার আশ্বাস দিয়েছেন। আমাদের পক্ষ থেকে সকাল-বিকাল পরিদর্শন চলমান আছে। আশাকরি এরকম সমস্যা আর দেখা দিবে না। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রতি বার্তা থাকবে যেকোনো অভিযোগ লিখিতভাবে প্রমাণসহ দিলে আমরা আর দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারব।”

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ২১ মে খাদ্য সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে চালু করা হয় টিএসসি ক্যাফেটেরিয়া। তবে দুই বছরের সেবায় কোনো উল্লেখযোগ্য প্রশংসা কুড়াতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। শুরুতে জামান হোটেল প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব নিলে তারা মানসম্মত সেবা দিতে ব্যর্থ হয় । একচেটিয়া ব্যবসা, অস্বাস্থ্যকর খাবার আর শিক্ষার্থীদের সাথে বাজে ব্যবহারের অভিযোগে একাধিকবার ক্ষুদ্ধ হয়ে ক্যাফেটেরিয়ায় তালা ঝুলিয়ে দেয় শিক্ষার্থীরা। পরবর্তীতে গত জুনে নতুন ইজারা পায় কস্তুরী রেস্তোরাঁ। তবে এরপরেও মেলেনি টেকসই সমাধানের। উল্টো পূর্বের তুলনায় সেবার মান খারাপ হয়েছে বলে প্রতিনিয়ত অভিযোগ করছেন শিক্ষার্থীরা।