জারীন তাসমীন সাবা:
পাহাড় আর সবুজের মোহনায় অবস্থিত চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)। প্রকৃতি ও আধুনিকতায় সুরেলা সঙ্গম এই ক্যাম্পাস। এখানকার প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি গাছ, প্রতিটি স্থাপনা যেন গল্প বলে, যেখানে শিক্ষার্থীরা খুঁজে পায় সৃষ্টিশীলতার অনুপ্রেরণা।
ক্যাম্পাসে প্রবেশেই বামে চোখে পড়ে গৌরবময় শহীদ মিনার, ভাষা আন্দোলনের চেতনা এবং জাতীয় ইতিহাসের গৌরবের প্রতীক। এর চারপাশের ছায়াদানকারী বৃক্ষরাজি এবং প্রশস্ত খোলা স্থান শিক্ষার্থীদের দেয় মানসিক প্রশান্তি। বিশেষ দিনগুলোতে এই শহীদ মিনারের প্রাঙ্গণে চুয়েটের শিক্ষার্থীরা আশেপাশের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিনামূল্যে পাঠদান করেন। বিভিন্ন বিষয় শেখানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা তাদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা সামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করতে দেখা যায়। এ উদ্যোগ শুধু তাদের জীবন আলোকিত করে না, বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক গুণাবলী জাগ্রত করে। গান, নাটক কিংবা গল্প বলার মাধ্যমে শিশুদের জন্য আনন্দময় পরিবেশ তৈরি করেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা।
এর কাছেই রয়েছে সদ্য নির্মিত মেডিক্যাল সেন্টার। আধুনিক নকশায় নির্মিত এই ভবনটির চারপাশে ছায়া দানকারী গাছের সুশৃঙ্খল সারি পরিবেশকে আরো শীতল ও প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
ক্যাম্পাসের প্রাণবন্ত স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম পুরোনো ১ ও ২ নম্বর ক্যান্টিন। এর কার্যক্রম বর্তমানে বন্ধ থাকলেও, ক্যান্টিন গুলোর সামনে ছাতা-সজ্জিত বসার জায়গাগুলোতে শিক্ষার্থীরা চায়ের কাপে জমায় আড্ডা। ক্লাসের ফাঁকে কিংবা ব্যস্ত দিনের শেষে এখানে সময় কাটানো যেন শিক্ষার্থীদের রুটিনের অংশ।
ক্যাম্পাসের অন্যতম জনপ্রিয় স্থান ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) ভবন। ভবনটির পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, আধুনিক নকশা ও প্রশস্ত প্রাঙ্গণ শিক্ষার্থীদের আড্ডা, মিটিং এবং সৃজনশীল কার্যক্রমের জন্য যথোপযুক্ত। ব্যস্ত দিনের ফাঁকে এখানে কিছুক্ষণ বসা যেন মানসিক শক্তি পুনরুদ্ধারের এক মধুর অভিজ্ঞতা। এখানে শিক্ষার্থীরা দিন-রাত পরিশ্রম করে নতুন প্রযুক্তির সম্ভাবনা উন্মোচনে।
ক্যাম্পাসের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত হতাশা চত্বর। নাম শুনলে মনে হতে পারে এ এক কোনো হতাশার স্থান, কিন্তু বাস্তবে এ যেন এটি শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রশান্তির অন্যতম ঠিকানা। ছায়াঘেরা বৃক্ষরাজি আর স্নিগ্ধ পরিবেশ ক্যাম্পাসে জায়গাটিকে বিশেষ করে তুলেছে।
হতাশা চত্বর পেরিয়ে, কেন্দ্রীয় মাঠ; চুয়েটের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এটিও এক বিশেষ জায়গা, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং অন্যান্য উৎসব আয়োজিত হয়ে থাকে। পুরো ক্যাম্পাসের প্রাণবন্ত করার রসদ যেন এ মাঠেই লুকানো।
কেন্দ্রীয় মাঠের পাশেই অবস্থিত চুয়েট স্কুল। এর পাশে শিশুদের জন্য নির্মিত ছোট্ট পার্কে রয়েছে দোলনা, স্লাইডসহ নানা খেলার সরঞ্জাম। এছাড়া, কেন্দ্রীয় মাঠের কাছাকাছি অবস্থিত চুয়েট জিমনেসিয়াম যেখানে নিয়মিত শারীরিক কসরত এবং অন্যান্য ব্যায়াম করা হয়, যা শিক্ষার্থীদের মন ও শরীর সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
গোল চত্বর থেকে ডানদিকে, চুয়েট ক্যাম্পাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা , যেমন ভিসি ভবন। এছাড়াও ক্যম্পাসজুড়ে রয়েছে প্রি-ইঞ্জিনিয়ারিং ভবন, লাইব্রেরি , একাডেমিক ভবন ১ , ইএমই ভবন এবং একাডেমিক ভবন ৫। চুয়েটের সুশোভিত ফুলের বাগান ও ছায়াদানকারী বৃক্ষরাজি পরিবেশের সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে তোলে। গাছের ছায়ায় হেঁটে যেতে যেতে এক ধরনের প্রশান্তি লাভ হয়, যা ক্যাম্পাসের প্রাণবন্ত পরিবেশের সাথে একটি সুমধুর সম্পর্ক তৈরি করে।
একাডেমিক ভবন ১, যেটি ১২ তলা ভবন হিসেবে পরিচিত, ক্যাম্পাসের সবচেয়ে উঁচু ভবন। এর ছাদ থেকে পুরো চুয়েট ক্যাম্পাসের অসাধারণ সৌন্দর্য দেখা যায়। সেখানে দাঁড়িয়ে, সবুজ গাছপালা, কাটা পাহাড়ের দৃশ্য এবং কেন্দ্রীয় মাঠের সার্বিক পরিবেশের এক অপরূপ দৃশ্য চোখে পড়ে। যা প্রত্যেকের জন্য এক অদ্বিতীয় অভিজ্ঞতা। এই দৃশ্য দেখে ক্যাম্পাসের প্রকৃতি ও স্থাপত্যের এক বিশেষ সংমিশ্রণ অনুভব করা যায়।
ইএমই ভবনের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য একটি মনোরম দিক। এখানে সযত্নে রোপিত ফুলের গাছগুলো ভবনটির অভ্যন্তরীণ পরিবেশকে আরো প্রাণবন্ত এবং সুরম্য করে তোলে, যা ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের মাঝে একটি শিথিল এবং অনুপ্রেরণামূলক পরিবেশ সৃষ্টি করে।
চুয়েটের আবাসিক হলগুলো যেন শিক্ষার্থীদের দ্বিতীয় বাড়ি।
ছাত্র হলগুলোর মধ্যে রয়েছে শেখ রাসেল হল, শহীদ মোহাম্মদ শাহ হল, শহীদ তারেক হুদা হল, ড. কুদরত ই খুদা হল, বঙ্গবন্ধু হল।আর ছাত্রী হলগুলো হলো- সুফিয়া কামাল হল, শামসেন্নাহার খান হল, তাপসী রাবেয়া হল।
চুয়েটের প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি পথ যেন গল্পের সাক্ষী। প্রকৃতির স্নিগ্ধতা আর আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর অপূর্ব মেলবন্ধন শিক্ষার্থীদের জন্য এক সৃজনশীল, প্রেরণাদায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করে। এ ক্যাম্পাস যেন শিক্ষার্থীদের নিজের মেধা ও সৃজনশীলতাকে প্রস্ফুটিত করার মুক্ত ক্ষেত্র। চুয়েট তাই কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, এটি প্রকৃতি ও প্রযুক্তির এক নান্দনিক মিলনস্থল।