ব্রেকিং নিউজ

সুনসান নীরব চুয়েট ক্যাম্পাস ; ফেরার অপেক্ষায় শিক্ষার্থীরা

সাঈদ চৌধুরী:

শহীদ মিনার প্রাঙ্গণটা ফাঁকা পড়ে আছে, নেই সেখানে কোনো আড্ডা। গোলচত্বরে বসার মত নেই কেউ। ক্যান্টিনগুলোতে ঝুলছে তালা। কাশেম মামা কিংবা সাদ্দাম মামার দোকানে চায়ের কাপে ঝড় তোলার দৃশ্যটাও যেন কোথায় হারিয়ে গিয়েছে আজ।

বলছিলাম পাহাড়ের কোলঘেষে অবস্থিত চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) কথা। গাছের ডালের সেই পাখিদের কলতানই যেন রাজত্ব করছে এই নীরব ক্যাম্পাসে।

চৈত্রের শেষের সময়টায়  শিক্ষার্থীদের হৈ-হুল্লোড় কিংবা নানা আয়োজনে মেতে থাকে চুয়েট ক্যাম্পাস। ক্লাস, ল্যাব-পরীক্ষা,এসাইনমেন্ট কিংবা প্রজেক্টের কাজের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা ব্যস্ত থাকে নানা কাজে। কিন্তু সেই দৃশ্য হঠাতই যেন ম্লান করে দিয়েছে একটি মরণঘাতি ভাইরাস।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে ছুটি ঘোষণা করায় ক্যাম্পাস এখন ফাঁকা। সেই সুযোগে প্রকৃতি যেন নিজের মতো সাজার চেষ্টা করেছে।

আজ নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে গল্প-আড্ডায় জমে উঠা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন চত্বর আর আবাসিক হলগুলো। এখন আর নেই ক্লাস করা কিংবা লাইব্রেরীতে পড়ার তাড়া। নেই হৈচৈ কিংবা কোলাহল। পরিচিত চত্তরগুলো শিক্ষার্থীর শূন্যতায় যেনো যৌবন হারিয়েছে। পুরো ক্যাম্পাস ও হলগুলোতে বইছে সুনশান নীরবতা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কতৃক ক্যাম্পাসে প্রবেশেও এখন নানা বিধিনিষেধ থাকায় এমন নীরব ক্যাম্পাস ও হল এর আগে কেউ দেখেনি। করোনা ভাইরাসের আতঙ্কে পুরো ক্যাম্পাস এখন কোলাহলমুক্ত।

হতাশার চত্বরটা আজ নিজেই যেন হতাশ। সেখানে আর কাউকে দেখা যায় না হাটতে কিংবা সাইকেল নিয়ে চক্কর দিতে। দেখা যায় না কাউকে সেলফি তুলতে। চুয়েট কেন্দ্রীয় খেলার মাঠটা খা খা করছে খেলোয়াড়ের অভাবে।নেই সেখানে কোনো ফুটবল, ক্রিকেট খেলার সেই চিরচেনা দৃশ্য।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে চুয়েট ১৮ মার্চ থেকে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এই কয়েকদিনে ক্যাম্পাসটা কী সুন্দরই না হয়েছে! গাছে গাছে কচিপাতা।  চারদিকে কেবল পাখিদের কিচিরমিচিরই শোনা যায়। গাছ, পাখি আর প্রাণী মিলে যেন নিজেদের ক্যাম্পাসে নিজেদের মতো সময় কাটাচ্ছে। এমন সুযোগ খুব বেশি যে তাদের জীবনে আসে না!

আবাসিক হলগুলোর সামনে গাদা, সূর্যমুখীসহ নানা ফুল ফুটে মনোমুগ্ধকর দৃশ্য সৃষ্টি করলেও সেই দৃশ্য উপভোগ করার মত কেউ নেই ক্যাম্পাসে। বঙ্গবন্ধু হল ও শহীদ মোহাম্মদ শাহ হল সংলগ্ন পুকুর পাড়টা আজ নীরবে পড়ে আছে। বন্ধুবান্ধব মিলে সেখানকার চিরচেনা আড্ডাটাও আজ হারিয়ে গেছে।

রুটিনমাফিক চলা নিত্যদিনের সঙ্গী পদ্মা,ইছামতি,রুপসা, গোমতি,হালদা,মেঘনা, মাতামুহুরি,সাঙ্গু,বুড়িগঙ্গা, তিস্তা, যমুনা কিংবা সুরমা নামের সেই চুয়েট বাসগুলোকে মিস করছে চুয়েটের প্রত্যেক শিক্ষার্থী। গোলচত্বরে সেই চুয়েট বাসের সারির দৃশ্য আজ আর চোখে পড়ে না। গ্যারেজেই রয়ে গেছে বাসগুলো।

ছুটোছুটি, উড়ো উড়ি,খুনসুটি আর মনের সুখে পাখিগুলো সাঁতার খেলায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে চুয়েট লেকে। আজ হয়ত ক্যাম্পাস খোলা থাকলে এই দৃশ্য চোখে পড়ত। লেকের ধারে বসার জায়গাগুলো ফাঁকা পড়ে আছে। নেই আর সেখানকার আড্ডা।

শহীদ মিনারের পাশে পদ্মপুকুরে পদ্মফুল ফুটে তার সৌন্দর্য প্রদর্শন করছে। পদ্মপুকুরের ধারে বসে সেই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করছে যেন প্রকৃতি নিজেই।

অডিটোরিয়াম,গোলচত্বর,  নবনির্মিত ক্যাফেটেরিয়া প্রাঙ্গণ কিংবা শহীদ মিনারে আর নেই জয়ধ্বনি, ডিএস, গ্রিন ফর পিস ও অন্য সংগঠনগুলোর আড্ডা। নেই   আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর কোনো সমাবেশ।

ক্যাম্পাসের মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য্যের ভূমিকায় নানাধরনের ফুলের গাছগুলো সকলের নজর কাড়ে এসময়। প্রতিবছর এই সময়েই চাষ করা হয় সূর্যমুখী, গাদা, গোলাপসহ রঙ বেরঙের ফুল। সূর্যমুখীগুলো মাথা উঁকি দিয়ে দাঁড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু সে সৌন্দর্য্য উপভোগ করার কেউ নেই। কেউ আজ বাগানের পাশ দিয়ে হেটে যায়নি। সূর্যমুখী,গাদা কিংবা গোলাপ ফুলগুলো নিজের মত করে সাজিয়ে নিয়েছে।

শাহরিয়ার নিলয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের ‘১৭ আবর্তের শিক্ষার্থী। অনুভূতি প্রকাশ করে জানালেন,ক্যাম্পাস হাসিমুখের হঠাৎ বিদায়, যেন একটা তুষারযুগ। সকালে তড়িঘড়ি করে ঘুম থেকে উঠেই ক্লাস,তারপর সেই ফাকে গিয়ে এককাপ চা,আবার ক্লাস করেই সেই চিরচেনা মুখগুলার সাথে একসাথে দুপুরে খাওয়া-উফফ চুয়েট। একি মায়া! ল্যাব করে কখনো কখনো আবার সবাই মিলে কাশেম ভাইয়ের দোকানের সামনে কিংবা বন্ধুদের নিয়ে ছোট মামা হোটেলে-স্মৃতিগুলো কিন্তু বেশ নাড়া দেয়।বন্ধু-আড্ডা-গান দিয়ে আবার ৫টার বাসে ছুটে চলা শহরপানে।আবার সেই চিরচেনা মুখগুলো নিয়ে ক্লান্ত হয়ে হলে ফেরা।

কোয়ারেন্টাইনের সময়গুলো আসলে আমাকে ভাবায় কয়েকবছর পর তো আসলেই এই সময়গুলো থাকবে না।তখন?মানিয়ে নিবো,মানুষ মানিয়ে নেয়।কিন্তু নিঃসন্দেহে জীবনের সবচাইতে সুন্দর কিছু সময় ছিল এইদিনগুলো-এই মানুষগুলো, প্রাণের ক্যাম্পাসে ফিরতে চাই খুব শীঘ্রই। বড়ভাই-বন্ধু-ছোটভাইগুলোর সাথে আবার বসতে চাই।সুন্দর সুন্দর সেসব রাতগুলোতে ফিরতে চাই।আমাদের গোলচত্ত্বর-হতাশা চত্ত্বর-পাহাড়ের মায়ায় ফিরতে চাই। তুষারযুগটা জলদি শেষ হোক। আমরা ফিরতে চাই চিরচেনা সেই সবুজের স্বর্গে।

কোয়ারেন্টাইন সময়ে ক্যাম্পাস নিয়ে অনুভুতি ব্যক্ত করলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তাড়িৎ ও দূরযোগাযোগ প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী মেহজাবিন সেজুতি। বলেন,খুব অপ্রিয় সকাল ৯টা থেকে  বিকেল ৫ টার জীবনটাও মনে হয় সুন্দর ছিলো,খুব সম্ভবত জায়গাটা চুয়েট বলেই!এই ক্যাম্পাসের প্রতিটা ছোট ছোট স্মৃতি আমার এই সময়টাকে আবেগপ্রবণ করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। গোল চত্ত্বরের ভাস্কর্যের সেই পতাকাটার মধ্যে দিয়ে আসা সুর্যের আলো,রাতের চুয়েট বাস,নতুন একটা ভোরের আলোয় আলোকিত হলের করিডোরটা,বোহেমিয়ান প্রিয়মুখ,বন্ধুদের প্রিয় হাসি যেন সবকিছুর স্মৃতিতেই বিষাদময় হয়ে আছে এই অদ্ভুতভাবে বন্দী সময়টা! কেউ জানিনা সেই সবুজ স্বর্গে,আমাদের স্বল্প সময়ের অথচ ভিটেমাটির মত প্রিয় ক্যাম্পাসে আবার ফিরতে পারব কিনা! তবুও আশা রাখি সুদিনের,স্বপ্ন দেখি অবশ্যই প্রচন্ড সুন্দর কোনো মুহূর্তে আমাদের আবার দেখা হবে। আবার সিএনজিতে করে কাপ্তাই, তাপবিদ্যুৎ এর দইচিড়া,এক নং ক্যান্টিনের আড্ডা,কাশেম মামার চা,নতুন কোন অনুষ্ঠানের জন্য ছক কাটা,বৃহস্পতিবারের চাদরাত আবার আসবে জীবনে। আর ততদিনে মানুষ বুঝে যাবে বেঁচে থাকা আর ভালোবাসা কতটা সুন্দর!

হোম কোয়ারেন্টাইন বিষয়টাই পুরোপুরি নতুন শিক্ষার্থীদের কাছে। পরিবারের সাথে সময় কাটানোর যে সুযোগ সবাই পেয়েছে সেটাও একদিকে ভাগ্যের ব্যাপার। তারপরও হোম কোয়ারেন্টাইন এর অনুভূতি হচ্ছে মুক্তপাখি খাঁচায় বন্দি হয়ে গেলে যেরকম ছটফট করে ভেতরে  সেরকমটাই কাটছে  কোয়ারেন্টাইন এর দিনগুলো। এভাবেই অনুভূতি প্রকাশ করলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী ফরহাদ শাহী আফিন্দী।

তিনি বলেন,স্মৃতির মায়ায় প্রায়শই ভীড় করে প্রিয় ক্যাম্পাসের আঙিনা আর বন্ধুত্বের গল্পগুলো। চুয়েটের সবুজ বৃক্ষরাজি, শহীদ মিনারে বসে আড্ডা কিংবা নর্থের ছাদে গলা ছেড়ে গান গাওয়ার সজীব-সুন্দর মুহূর্তগুলো প্রতিদিন ভেসে উঠে চোখে। অনেক বেশি মিস করি আমার রুম নর্থ-২১৫ , আমার বন্ধু-সিনিয়র-জুনিয়রদের। আসার আগেও যাদের সাথে কোলাকুলি করে এসেছি সবাইক একসাথে ফিরবো বলে।প্রিয় চুয়েট বাস, অসময়ে গোডাউন-বেতাগী কিংবা লাম্বুরহাট, দলবেঁধে কাপ্তাই অথবা চিতমরম। আহা! কতোকিছু যে মিস করছি। ভেবেছিলাম ৩১ই মার্চের মধ্যেই হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে সবাই ফিরে আসবো চুয়েটে। কিন্তু এখনো সবাই আতঙ্কিত জীবন নিয়ে প্রিয় মাতৃভূমি নিয়ে। কি হবে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের! বাঙালিরা যেকোনো প্রতিকূল সময়েও নিজেদের রক্ষা করেছে অতীতে, তবে এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। তাও যেভাবে সবাই সবাইকে সহযোগিতা করে যাচ্ছে, চুয়েটিয়ানরা নিজ জায়গা থেকে  সাহস ও শক্তি জাগানিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দুস্ত, অসহায় মানুষের পাশে দাড়িয়েছে চুয়েটের শিক্ষার্থীরা। মনে হচ্ছে এই তো আর ক’টা দিন। মহামারীর দিনগুলোও আমরা জয় করবো। ফিরে আসবো সবার মাঝে ১৭১ একরের প্রিয় চুয়েট ক্যাম্পাসে।

‘১৯ আবর্তের পানিসম্পদ কৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী ফারজিয়া আহমেদ রাফা অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন,
খুব মিস করছি আমার প্রানের চুয়েট ক্যাম্পাসকে। মার্চের মাঝামাঝি কোন এক দিনে হঠাৎ ক্লাস বন্ধের সংবাদে বাসায় চলে এসেছিলাম।কিন্তু বুঝতে পারিনি সেটা এতটা দীর্ঘ হয়ে যাবে।সেই থেকে আজ অব্দি গৃহবন্দী।খুব খুব মনে পড়ছে ক্যাম্পাস এর দিন গুলোর কথা।নবীন শিক্ষার্থী হিসেবে এখনো বেশি দিন উপভোগ করতে পারিনি ক্যাম্পাস জীবনকে।তবুও সেই শ্রেণীকক্ষ, গোলচত্ত্বর, তিন নং ক্যান্টিনের চা,চুয়েট বাসে উঠে বসে থাকা,বিভিন্ন অনুষ্ঠানের রিহার্সালের সময়ে গ্যালারির সেই আড্ডা যেন ভুলবার নয়। আর সবচেয়ে বেশি মিস করছি আমার শামসেন্নাহার খান হল আর রুম-১১৫ । মিস করছি রুম্মেটদের। আর যেন এই ঘরে থেকে উঠতে পারছিন। কবে যাব সেই প্রানের ক্যাম্পাসে? কবে দেখা পাব সেই প্রিয় মুখগুলোর? ভাবলেই যেন দিন রাত এক হয়ে যাচ্ছে। তবুও ভাল থাকুক আমার চুয়েটের মানুষগুলো। আবার আমরা ফিরে যাব আমাদের প্রানবন্ত চুয়েট এ সেই চেনা যায়গায়,চেনা মানুষ গুলোর কাছে।

চুয়েট ক্যাম্পাস যেন এক ভালোবাসার নাম। দূরে থাকলে জিনিসটা আরও বেশী করে অনুভব হয়। তবুও পরিস্থিতি বিবেচনায় আমাদের দূরে থাকতে হচ্ছে বলে জানালেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী হৃদয় ইসলাম। তিনি আরও বলেন,ক্যাম্পাসে বড় ভাইদের সাথে, ছোট ভাইদের সাথে অথবা বন্ধুদের সাথে সেই আড্ডা যেন আর অন্য কোথাও সম্ভব নয়। চুয়েট জীবনের নিয়মমাফিক সেই ব্যস্ততা অনেক মিস করছি। এই ব্যস্ততায় সময় অনেক দ্রুত চলে যেত। মিস করি শহরে যাওয়ার জন্য চুয়েট বাসে সিট রাখার প্রতিযোগিতা। ক্যান্টিনে আড্ডা, ডাইনিং আর হল লাইফ যেন আরেক ভালোবাসার নাম। ক্যাম্পাসের এত অনুভুতি বলেও শেষ করা সম্ভব নয়। আশা করি এই দুঃসময় পেরিয়ে সবাই ফিরে আসবে, ক্যাম্পাস আবার তার প্রাণ ফিরে পাব। আবার সেই পরিচিত প্রিয় মুখগুলো দেখা মিলবে।