ব্রেকিং নিউজ

প্রকৌশলবিশ্বের বৃহত্তম সেতু

আতাহার মাসুম তারিফ:

চীন আয়তনের দিক থেকে পৃথিবীর চতুর্থ(এশিয়ার ১ম) এবং পৃথিবীর বৃহৎ জনগোষ্ঠীর একটি রাষ্ট্র। চীনের স্থাপত্য বলতে সবাই সেই “মহাপ্রাচীর”কে চিনে।

প্রকৌশলিক মেধাকে কাজে লাগিয়ে চীন একের পর এক তাজ্জব স্থ্যাপনা বানিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে। তারই ফলাফল স্বরূপ “হংকং-জুহাই সেতু”-বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বৃহত্তম সেতু।

চীনের মূল ভূখণ্ডে হংকং এবং ম্যাকাও শহরকে সংযুক্ত করে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে খোলা হয়েছে গত ২৪শে অক্টোবর।

এর আগের দিন ২৩শে অক্টোবর চীনের প্রেসিডেন্ট জী জিপিং এবং হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী ক্যারি ল্যামের উপস্থিততে ব্রীজটি খুলে দেয়ার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। ৫৫ কিলোমিটার (৩৪ মাইল ) লম্বা এই সেতুটি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় সেতু।

১৫ই সেপ্টেম্বর ২০০৯ সালে চীনা পার্শ্বে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়,কিন্তু সেতুটির পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে আইনী জটিলতা থাকার কারণে হংকং পার্শ্বের নির্মাণকাজ একটু দেরীতে অর্থাৎ ডিসেম্বর ২০১১ এর দিকে শুরু হয়েছিল।

পুরো প্রকল্পের নির্মাণকাজ ৬ই ফেব্রুয়ারী ২০১৮ তে সম্পন্ন হয়। ৩ স্প্যান এবং ৬ লেইনের এই দানবীয় ব্রীজের স্থায়িত্বকাল প্রায় ১২০ বছর। ১২৬.৯ বিলিয়ন ইউয়ান (১৮.৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) খরচ দিয়ে নির্মিত। সেতুটি সম্পূর্ণ অতিক্রম করতে প্রায়ই সাড়ে তিনঘন্টা মতো সময় লাগে।

এই সেতুর কি এমন বিশেষত্ব?

ভূমিকম্প ও টাইফুন প্রতিরোধীভাবে ডিজাইন করা হয়েছে এই ব্রীজটি,যেখানে প্রায় ৪০০,০০০ টন ইস্পাত ব্যবহার করা হয়েছে । যা আসলে ৬০টি আইফেল টাওয়ার নির্মাণের জন্য যথেষ্ট ছিল। তার দৈর্ঘ্যের প্রায় ৩০ কিলোমিটার পার্ল নদীর সমুদ্রসীমা অতিক্রম করে।

জাহাজের অনুমতি দিতে, ব্রীজের নিচ দিয়ে যাওয়ার জন্য প্রায় ৬.৭ কিলোমিটার অংশজুড়ে একটি টানেল এবং দুটি কৃত্রিম দ্বীপের স্থাপনা রয়েছে।

যে কেউ কি এই সেতুতে ড্রাইভ করতে পারবেন?

না। যারা সেতুটি অতিক্রম করতে চাইবে তাদের অবশ্যই কোটা সিস্টেম দ্বারা বরাদ্দকৃত বিশেষ অনুমতিপত্র ব্যবহার করতে হবে এবং সব যানবাহনকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টোল দিতে হবে।

বর্তমানে হংকং থেকে ঝুহাই পর্যন্ত প্রাইভেট যানবাহনগুলির মধ্যে শুধুমাত্র ১০,০০০ যানবাহন অনুমতিপ্রাপ্ত। এ ছাড়াও, অন্যান্য অঞ্চলের যানবাহন হংকং এবং ম্যাক্যাওয়ে প্রবেশের জন্য অনুমোদিত যানবাহনগুলির সংখ্যা দৈনিক কোটা সাপেক্ষে।

সেতুটিতে কোনো প্রকার গণপরিবহণ চলাচল করা যাবে না। তার উপর কোন প্রকার রেলের সংযোগও নেই। কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে অনুমান করে যে প্রতিদিন ৯,২০০টি যানবাহন সেতু অতিক্রম করবে। পরে অঞ্চলে নতুন পরিবহন নেটওয়ার্ক নির্মিত হওয়ার পরে তারা তাদের অনুমান বাড়িয়ে দিবে।

জল দ্বারা বিচ্ছিন্ন তিনটি প্রধান শহর হংকং,ঝুহাই এবং মাকাউকে ভৌগোলিকভাবে খুব কাছে নিয়ে এসেছে এই সেতুটি । শহর তিনটিকে সংযুক্ত করার মাধ্যমে উভয়দেশের অর্থনীতি আগের তুলনায় অনেকাংশে বেড়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। সেতুটি চীন এবং হংকংয়ের পারস্পরিক দূরত্ব এবং অর্থনীতিকে আরো সন্নিকটে নিয়ে আসছে।

ব্রীজে নিযুক্ত কর্মকর্তারা চাইনিজ সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে মূল ভূখন্ডে কাজ করার সময় ১৮জন নির্মাণশ্রমিক মারা গেছে এবং নির্মাণকালে শত শত শ্রমিক আহত হয়েছে। যার কারণে ব্রীজটিকে কিছু স্থানীয় গণমাধ্যম “মৃত্যু সেতু” নামেও ডাকে।

যদিও এটি একটি চিত্তাকর্ষক প্রকৌশল কৃতিত্ব তবুও পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে উদ্বেগ আছে এই প্রকল্প।

পরিবেশবাদীদের মতে “বিরল চীনা সাদা ডলফিন সহ এলাকার সামুদ্রিক জীবন গুরুতরভাবে ক্ষতি হতে পারে।” ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার (ডব্লিউডব্লিউএফ) এর হংকং শাখার মতে, হংকং পার্শ্বে জলের মধ্যে দেখা দেওয়া ডলফিনের সংখ্যা গত ১০ বছরে ১৪৮ থেকে ৪৭ নেমে গেছে এবং এখন তারা সেতুর কাছাকাছি জলের থেকে অনুপস্থিত।

পরিবেশবাদীরা আরো মনে করেন,সেতুটির কারণে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য এবং খনিজসম্পদ প্রায়ই বিলীন হতে চলছে।

সোর্সঃ উইকিপিডিয়া,বিবিসি ইন্টারন্যাশনাল

আতাহার মাসুম তারিফ
তাংঃ ০৯.১১.২০১৮