ব্রেকিং নিউজ

চুয়েটের অদূরে কাটা পাহাড়ে নবাগত শিক্ষার্থীদের র‍্যাগিংঃ অভিযুক্তদের শিক্ষক কর্তৃক মারধরের অভিযোগ

চুয়েটনিউজ২৪ডেস্কঃ

র‍্যাগিং কার্যক্রম বন্ধ করতে গিয়ে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) শিক্ষকের বিরুদ্ধে ২য় বর্ষের ৬জন শিক্ষার্থীকে গায়ে হাত তোলার অভিযোগ উঠেছে। এরকম অভিযোগে বুধবার রাত ৩টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস উত্তাল হয়ে উঠেছে। এসময় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ছাত্রকল্যাণ পরিচালকের কার্যালয়ের জানালা এবং নেমপ্লেট ভাঙার অভিযোগও উঠেছে।

অভিযুক্ত পক্ষ বলেছেন শিক্ষার্থীরা র‍্যাগিংয়ের অভিযোগটি ধামাচাপা দেয়ার জন্য এরকম পাল্টা বানোয়াট অভিযোগ অানছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল ৯ টার দিকে প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী মিছিল নিয়ে উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয়। এসময় তারা ছাত্রকল্যাণ দপ্তরের শিক্ষকদের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক হতে জানা যায়, বুধবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ্ববর্তী কাটাপাহাড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রথম বর্ষের (১ম বর্ষ) ৮জন শিক্ষার্থীকে র‍্যাগ দেয়া অবস্থায় একই বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ৬জন শিক্ষার্থীকে হাতেনাতে আটক করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা কমিটির সদস্যরা। এসময় প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা র‍্যাগিং এর ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জানায়। এছাড়া র‍্যাগিং এর ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদেরকে এধরণের কাজ আর করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে শিক্ষকদের হাতে-পায়ে ক্ষমা চাইতেও দেখা যায়।

বুধবার রাতে কাটাপাহাড় থেকে জড়িত সকল শিক্ষার্থীদের টিচার্স ক্লাব কোয়ার্টারে নিয়ে আসা হয়।
তখন ঘটনাস্থলে দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আনোয়ার পারভেজ হাঁপানী জনিত কারণে অসুস্থ হয়ে পড়লে উপস্থিত শিক্ষকরা তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব হাসপাতালে পাঠায়। এসময় দায়িত্বরত ডাক্তার শাহাবুদ্দীন তার হাতে আঘাতের চিহ্ন পাওয়ায় তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। পরবর্তীতে রাত তিনটার দিকে তার সহপাঠীরা এঘটনা জানতে পেরে উত্তেজিত হয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। পরে আহত শিক্ষার্থীকে সকাল ৫ টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের এম্বুলেন্স যোগে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এবং একই এম্বুলেন্সে সকাল সাড়ে ৬ টায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরত আনা হয়। এসময় ডাক্তার শাহবুদ্দীন বলেন, হাতে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। কিন্তু এটা ফ্রাকচার কিনা তা এক্সরের রিপোর্ট দেখে কোনো রেডিওলজিস্ট বলতে পারবেন।

এসময় আহত শিক্ষার্থী  আনোয়ার পারভেজকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি ছাত্রকল্যাণ উপ-পরিচালক আরাফাত রহমান রানা এর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বলেন, স্যার গতকাল রাতে আমাদেরকে কাটা পাহাড়ে পেয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছেন এবং গাছের ডাল ভেঙে  মেরেছেন। পরবর্তীতে আমি অসুস্থ হয়ে গেলে আমাকে প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রথমে ২০ মিনিট অক্সিজেন মাস্ক পড়ে থাকি। কিন্তু এসময় আমার হাত ফুলতে থাকে এবং প্রচন্ড ব্যাথা হওয়ায় আমি সহ আমার ছয়জন বন্ধুকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় অভিযুক্ত বাকি ৫ জনও তাদেরকে শারীরিক নির্যাতন করার অভিযোগ আনে এবং তাদের ক্ষতগুলো উপস্থিত সাংবাদিকদের দেখান।

কথা বলার জন্য কাটাপাহাড়ে কেন নিতে হবে এমন প্রশ্নের উত্তরে পারভেজ বলেন, আমরা পাহাড়তলী থেকে গল্প করতে করতে গৌরীশঙ্কর চলে যাই। সেখান থেকে আমরা ভাবি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই নম্বর গেট দিয়ে ক্যাম্পাসে ঢুকবো। এই উদ্দেশ্যে আমরা হাঁটছিলাম। কাটাপাহাড়ের দিকে যাওয়ার কোনো উদ্দেশ্য আমাদের ছিল না।

তারা যদি কোনো অপরাধ না করেই থাকে তাহলে কেন শিক্ষকদের কাছে হাতে-পায়ে ক্ষমা চাইছিলো এই প্রশ্নের উত্তরে পারভেজ জানান, শিক্ষকেরা আমাদের প্রথম থেকেই বলে আসছিলেন, আমাদের পুলিশের হাতে হস্তান্তর করা হবে। সাধারন পরিবারের ছেলে হিসেবে আমরা ভয় পেয়েই মূলত তাদের কাছে ক্ষমা চাইতে থাকি।

মারধরে অভিযুক্ত ছাত্রকল্যাণ উপ-পরিচালক আরাফাত রহমান রানা বলেন, যাদেরকে র‍্যাগিং এর অভিযোগে গতকাল কাটাপাহাড় থেকে ধরা হয়েছে তাদের নূন্যতম শাস্তি হলো আজীবন হল বহিষ্কার এবং এক বছরের একাডেমিক বহিষ্কার। তারা এই শাস্তি এড়ানোর জন্য এধরনের বানোয়াট পরিকল্পনা করছে।

আনোয়ার পারভেজ এর হাতে আঘাত পেল কিভাবে এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা তাদেরকে যে রাস্তায় পাই সে রাস্তাটি মূলত ইট আর সুড়কির তৈরি। এই রাস্তায় তাদের যখন ধাওয়া করা হয় তাদের একজন পড়ে যায়। তখনি হয়তো আঘাত পেয়ে থাকবে।

যাদের উপর র‍্যাগিং এর শিকার হওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাদের পক্ষ থেকে ১ম বর্ষের আফনান রহমান বলেন, গতকাল ভাইয়েরা আমাদের পাহাড়তলীতে ডাকে।তারা আমাকে কেক কিনে দেয় এবং তাদের সাথে কিছুদূর হাঁটার জন্য বলে। তখন স্যাররা এসেই ভাইদের মারতে শুরু করে এবং এসময় আমাকেও মারে। কিন্তু আমার বন্ধুরা যখন বলে আমি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী তখন আমাকে ছেড়ে দেয়।

তাদেরকে কোনো ধরনের র‍্যাগিং বা শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে তারা বলে, আমরা কোনো ধরনের র‍্যাগিং এর শিকার হইনি। এমনকি ভাইরা আমাদের সাথে উচ্চস্বরে কথাও বলেনি। তারা অভিযোগ লিখেছে কিনা এমন উত্তরে বলেন, আমাদের সাথে আসলে অভিযোগ করার মত কিছুই ঘটেনি। স্যাররা আমাদের কি ঘটেছে এটা লেখার জন্য বলায় আমরা লিখেছি। শিক্ষকেরা না বললে আমরা অভিযোগ লিখতাম না।

তবে এমন ঘটনায় অনেক শিক্ষার্থী মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এমন অনেক শিক্ষার্থী বলেন, র‍্যাগিং এর জন্য কাটাপাহাড় অনেক আগে থেকেই কুখ্যাত। সেখানে তাদেরকে শুধু মাত্র হাঁটার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এমনটা ভাবাও হাস্যকর।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ রফিকুল আলমের সাথে কথা বললে তিনি জানান, আমরা শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী দুই পক্ষের কথা শুনেছি এবং একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করে দিয়েছি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের সাপেক্ষে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।