ব্রেকিং নিউজ

করোনায় অসচ্ছলদের পাশে চুয়েটের প্রাক্তনরা

চুয়েটনিউজ২৪ডেস্ক:

বর্তমানে পুরো বিশ্বে আতংকিত একটি নাম নভেল করোনা ভাইরাস। যার ভয়াল থাবায় ক্ষতিগ্রস্থ বাংলাদেশও। প্রতিদিন বেড়েই চলেছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। যা আজ রেকর্ড সংখ্যক আকার  ধারণ করেছে। সরকারি নিদের্শনা মোতাবেক করোনা মোকাবেলায় সব ধরনের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। মেধাবী শিক্ষার্থীরা আজ আতংকের পাশাপাশি ভাবতে হয় তাদের পরিবারকে নিয়ে। অনেক শিক্ষার্থীর টিউশনের উপার্জন দিয়ে দুমুঠো খাবার আর ছোট ভাই-বোনের পড়াশোনা চলতো। তারা এখন প্রায় অচলাবস্থায় আছে।

এই মুহূর্তে এই ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার চাইলেই পারছে না কারও কাছে  সাহায্য চাইতে। বিপাকে পড়া এই সব পরিবারের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য এগিয়ে এসেছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) শিক্ষক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ‘চুয়েটিয়ান কোভিড-১৯ ফান্ড’ শিরোনামে নামক একটি একটি তহবিল তৈরি করা হয়েছে। আমেরিকা, কানাডা,ওমান,দুবাই, সৌদি, এবং বাংলাদেশে অবস্থান করা চুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অর্থায়নেই গড়ে উঠেছে এই তহবিল। এর বড় একটি অংশই এসেছে অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান করা চুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের থেকে। এ বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ার চুয়েটিয়ানদের যুগ্ম সচিব প্রকৌশলী হাসান জিয়াদ বলেন, আমরা অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করা চুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা ক্যারিয়ার, চাকরি বা কোনো মেডিকেল ইস্যুতে চুয়েটিয়ানদের জন্য সর্বদা গর্বিত বোধ করি। অস্ট্রেলিয়ায় চুয়েটিয়ানরা চুয়েটে বিদ্যমান কোনো সমস্যা বা অনুষ্ঠানের পাশে সর্বদা ছিলেন এবং থাকবেন।

দেশ-বিদেশে বিভিন্ন স্থানে অবস্থানরত চুয়েটিয়ান প্রকৌশলীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে তহবিলের কাজটি সফলতার সাথে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে । চুয়েটিয়ানস কোভিড-১৯ ফান্ডের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১৭ লাখ টাকা। ১২ এপ্রিল থেকে নিম্ন মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীদের জন্য অর্থ সংগ্রহ শুরু করে ইতিমধ্যে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকা সংগ্রহ করে ফেলেন।

চুয়েটের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব এক পরিবার থেকে তার উঠে আসা। চট্টগ্রামে শহরে টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার খরচ যোগাতো ও বাবা-মায়ের কাছে টাকা পাঠাতো। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটিতে দেশ কার্যত লক ডাউনে বিরূপ প্রভাব পড়েছে সংগ্রামী এই শিক্ষার্থীর ওপরে। টিউশনি বন্ধ,কিন্তু এই টিউশনির টাকা গুলোয় ছিল তার সম্বল। বাড়িতেও খাবার ফুরিয়ে যাচ্ছে। পরের সপ্তাহের খাবার কিভাবে জুটবে এই চিন্তা ক্রমশই তাকে ঘিরে ধরছিলো। আত্মসম্মানবোধ থেকে কাউকে বলতেও পারছিলেন না এই কথা। কিন্তু এই কঠিন সময়ে এগিয়ে আসলো ওর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা।

তবে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল পরিচয় গোপন রেখে নিম্ন মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীদের খুঁজে বের করে তাদের পথচলায় সঙ্গী হওয়া। আর এই কাজটিই অত্যন্ত সুনিপুণভাবে করলেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. জি এম সাদিকুল ইসলাম। পরিচয় গোপন করার নিমিত্তে তিনি গুগল ডকের মাধ্যমে আবেদনকৃত ১০০ শিক্ষার্থীর এক তালিকা তৈরি করেন এবং ইতিমধ্যে ৪২ জন শিক্ষার্থীর জন্য তাদের সংগ্রামী পথকে সহজ করতে কিছু উপহার পাঠান।

কিন্তু প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা এখানেই থেমে থাকতে চাইছেন না। তারা নিম্নমধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি আরো দুইটি প্রকল্প চালিয়ে যেতে চান। মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম রাসেল  জানান , আমরা তিনটি লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আগাচ্ছি। প্রথম লক্ষ্য হলো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে অধ্যয়নরত অনুজদের আর্থিক সহযোগিতা করা, যেটি প্রায় সফলতার সাথে সম্পন্ন হচ্ছে। পরবর্তী পদক্ষেপ হবে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও অস্বচ্ছল ৫০০ পরিবারের তিনদিনের খাবারের ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি ডাক্তার,পুলিশ সহ যারা করোনাভাইরাস এর বিস্তার রোধে কাজ করে যাচ্ছেন তাদের জন্য পিপিই , স্যানিটাইজার , বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অটোমেটিক হ্যান্ড স্যানিটাইজার মেশিন বসানো এবং অন্যান্য সুরক্ষা সামগ্রী এর ব্যবস্থা করা। এসব বিষয়ে তিনি বলেন, এই তিনটি প্রকল্পের জন্য আমাদের প্রাথমিক বাজেট হচ্ছে ১৭ লাখ টাকা। যার অনেকাংশই আমরা সংগ্রহ করে ফেলেছি। খুব শীঘ্রই আমরা আমাদের পরিকল্পনা শতভাগ বাস্তবায়ন করবো।

এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা জীবন যুদ্ধে  লড়াই করা শক্তি পাচ্ছেন এমন মনোভাব ব্যক্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমার বাবা অনেক আগেই মারা যান। পরিবারের খরচ আমাকেই বহন করতে হতো। টিউশনি করে নিজের আর পরিবারের খরচ চালাতাম। কিন্তু মহামারি করোনার ছোবলে এখন টিউশানি বন্ধ থাকায় খরচ চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ভয়ংকর এই দুর্যোগের সময় কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। এই সময়ে শিক্ষক এবং অগ্রজ ভাইয়েরা যেভাবে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তা সত্যিই আমাকে সাহস যুগিয়েছে। চুয়েট পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে গর্ববোধ করছি।

প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের এসব উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ রফিকুল আলম বলেন,  আমাদের বেশীরভাগ শিক্ষার্থীরা একদম সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসে। পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করে তারা নিজেদের এবং অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের ব্যয়ভার কিছুটা হলেও বহন করে। দেশের এই মহাদুর্যোগের সময় তাদের অবস্থা আসলেই দুঃখ জাগানিয়া। প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা তাদের চুয়েট পরিবারে কনিষ্ঠতম সদস্যদের জন্য এগিয়ে আসছে, এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না।

অর্থ সহায়তার জন্য নিচের লিংকে ক্লিক করুন-
‘CUETIANS COVID-19 Fund’