ব্রেকিং নিউজ

অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী: ফাদার অব দ্যা ইঞ্জিনিয়ারস

ফজলুর রহমান:

চলে গেলেন জাতীয় অধ্যাপক, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা, দেশের প্রকৌশল জগতের কিংবদন্তী ব্যক্তিত্ব, বিশিষ্ট প্রকৌশল শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর। নিভে গেল নিরন্তর বিলিয়ে যাওয়া একটি জ্ঞান প্রদীপ।

গত সোমবার বাংলাদেশ হারিয়ে ফেলেছে একজন বিশ্বখ্যাত প্রকৌশলী, গবেষক, শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী, তথ্য-প্রযুক্তিবিদকে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা। তিনি ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের উপাচার্য ছিলেন। ২০১৮ সালের ১৯ জুন বাংলাদেশ সরকার তাকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল।

গত কয়েক দশকে যেসব বড় বড় ভৌত অবকাঠামো হয়েছে, তার প্রায় সবগুলোতেই কোনো না কোনোভাবে তিনি যুক্ত ছিলেন। ১৯৯৩ সালে যাঁদের হাত দিয়ে বাংলাদেশের ইমারত বিধি তৈরি হয়েছিল, জামিলুর রেজা চৌধুরী তাঁদের একজন। দেশের প্রথম মেগা প্রকল্প বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণে পাঁচ সদস্যের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। এখন দেশের সবচেয়ে বড় যে পদ্মা সেতু তৈরি হচ্ছে, সেই প্রকল্পের আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্যানেলেরও নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন তিনি। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেলসহ চলমান নানা উন্নয়ন প্রকল্পেও বিশেষজ্ঞ প্যানেলের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী।

অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী ছিলেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) পরিবারের একজন অতি আপনজন। তিনি সাবেক বিআইটি, চট্টগ্রাম (বর্তমান চুয়েট) এর গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান হিসেবে গৌরবময় ভূমিকা পালন করেন। চুয়েট-এর অগ্রযাত্রায়ও তিনি শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে আমৃত্যু সবসময় পাশে ছিলেন।
তিনি চুয়েটের সিলেকশন বোর্ড মেম্বার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০১২ ও ২০১৬ সালে চুয়েটের সম্মানিত সমাবর্তন বক্তা হিসেবে উপস্থিত থেকে গ্রাজুয়েটদের উদ্দেশ্য মূল্যবান দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন।
বিশেষভাবে আরেকটি উজ্জ্বল উপস্থিতির কথা স্বীকার করতে হয়।

চুয়েটের আয়োজনে ২০১৪ সালে কক্সবাজারে বসে দেশ-বিদেশের গবেষক ও বিজ্ঞানীগণের মিলনমেলা। এই আন্তজার্তিক কনফারেন্সের নাম ছিল 9th International Forum on Strategic Technology (IFOST 2014)অনুষ্টিত হবে। উক্ত কনফারেন্সে বিভিন্ন দেশের শতাধিক এবং বাংলাদেশের দুই শতাধিক গবেষক, বিজ্ঞানী, প্রফেশনাল অংশ নেন। এ উপলক্ষে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী। এসময় তাঁর জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য তন্ময় হয়ে শুনতে থাকেন দেশ-বিদেশের ব্যক্তিবর্গ। এছাড়া চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের আন্তর্জাতিক কনফারেন্সসহ আরো নানা প্রেস্টিজিয়াস ইভেন্টে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাঁর অবদান চুয়েট পরিবার চিরদিন কৃতজ্ঞচিত্তে ম্মরণ করবে।

জামিলুর রেজা চৌধুরী ১৯৪২ সালের ১৫ নভেম্বর সিলেট শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা প্রকৌশলী আবিদ রেজা চৌধুরী এবং মাতা হায়াতুন নেছা চৌধুরী। তিন ভাই দুই বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। পিতার চাকরির সুবাদে দেশের বিভিন্ন জায়গায় তার শৈশবকাল কেটেছে। তিন বছর বয়সে সিলেট ছেড়ে পরিবারের সঙ্গে চলে যান আসামের জোড়হাটে। ১৯৪৭ সালের আগস্টে আবার সিলেটে ফিরে আসেন। এরপর তার পিতা বদলি হয়ে ময়মনসিংহে চলে যান।

তিনি ১৯৫৭ সালে সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন। এরপর ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৫৯ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য তিনি ভর্তি হন আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়)। ১৯৬৩ সালে তিনি প্রথম বিভাগে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন।

বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ফলাফল প্রকাশের কয়েকদিন পর নিয়োগপত্র ছাড়াই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেন তিনি। পরবর্তীতে ১৯৬৩ সালের নভেম্বর মাসে তিনি প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন পুরকৌশল বিভাগে। এভাবেই তার শিক্ষকতা জীবন শুরু হল। ১৯৬৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বার্মাশেল বৃত্তি নিয়ে চলে যান ইংল্যান্ডে। এই বৃত্তি বছরে একটাই দেয়া হতো। সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি এমএসসি করেন, অ্যাডভান্স স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। থিসিসের বিষয় ছিল, কংক্রিট বিমে ফাটল। ১৯৬৮ সালে তিনি কম্পিউটার এইডেড ডিজাইন অব হাইরাইজ বিল্ডিং বিষয়ের উপর পিএইচডি করেন। পিএইচডি শেষ করে দেশে ফিরে তিনি বুয়েটের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।

এরপর ১৯৭৩ সালে সহযোগী অধ্যাপক ও ১৯৭৬ সালে অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পান। ২০০১ সাল পর্যন্ত বুয়েটে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এর মধ্যে কখনো বিভাগীয় প্রধান ছিলেন, ডিন ছিলেন। বুয়েটের কম্পিউটার সেন্টারের পরিচালক ছিলেন প্রায় ১০ বছর। ১৯৭৯ সালে ব্যাংককে UNESCAP- এ কয়েক মাস পরামর্শক হিসেবে ছিলেন। ১৯৭৪-১৯৭৫ সালে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে তিনি যুক্তরাজ্যের সারে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং এসোসিয়েট প্রফেসর ছিলেন। ২০০১ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৭ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিআইটির গভর্নিং বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন।

১৯৯৬ সালে বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দেখভাল করতে হয়েছিল তাকে। বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদের চেয়ারম্যান ছিলেন ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত। তিনি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন যুক্তরাজ্যের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের ফেলো। যুক্তরাজ্যের একজন চার্টার্ড ইঞ্জিনিয়ার, বাংলাদেশ কম্পিউটার সোসাইটির ফেলো। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সভাপতি ছিলেন। বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটি এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা), বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন৷ অধ্যাপক চৌধুরী বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনের সফটওয়্যার রফতানি এবং আইটি সার্ভিস রপ্তানী-সংক্রান্ত টাস্ক ফোর্সের চেয়ারম্যান ছিলেন ১৯৯৭ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত। তিনি প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি টাস্কফোর্সের একজন সদস্য। এছাড়া তিনি আরো অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও জড়িত। সবশেষ তিনি ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের উপাচার্য হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

দেশে-বিদেশে বিভিন্ন অবদানের জন্য সমাদৃত জামিলুর রেজা চৌধুরীর ৬৯টি গবেষণা-প্রবন্ধ রয়েছে।
তাঁর স্ত্রীর নাম সেলিনা নওরোজ চৌধুরী; তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফলিত পদার্থবিদ্যায় মাস্টার্স ডিগ্রিধারী। ব্যক্তিজীবনে তিনি দুই সন্তানের জনক; বড় সন্তান (মেয়ে) কারিশমা ফারহিন চৌধুরী পেশায় পুরকৌশলী এবং ছোট সন্তান (ছেলে) কাশিফ রেজা চৌধুরী ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রী করেছেন।

পুরস্কার ও সম্মাননা
একুশে পদক (২০১৭)
শেলটেক পুরস্কার (২০১০)
বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশন স্বর্ণপদক (১৯৯৮)
ড. রশিদ স্বর্ণপদক (১৯৯৭)
রোটারি সিড অ্যাওয়ার্ড (২০০০)
লায়ন্স ইন্টারন্যাশনাল (ডিস্ট্রিক-৩১৫) স্বর্ণপদক
ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছেন। তিনিই একমাত্র বাংলাদেশি, যিনি একটি ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকৌশল বিষয়ের ওপর এ ধরনের ডিগ্রি পেয়েছেন জাইকা রিকগনিশন অ্যাওয়ার্ড।

খ্যাতিমান প্রকৌশলী জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী সোমবার(৪মে) রাত ২টার দিকে ঘুমের মধ্যে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। অবসান ঘটে সর্বজন শ্রদ্ধেয় একটি জীবনের।

চুয়েট পরিবারের সাথে দীর্ঘ সম্পর্কের কারণে এই গুণীজনের সান্নিধ্যে বেশ কয়েকবার আসার সৌভাগ্য হয়। সুন্দর মুখে মিষ্টি হাসি লেগে থাকতো। নিরহংকার। জ্ঞানীর অবয়ব চলনে বলনে। দেশের প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের শিরোমণি ছিলেন। তাই সকলে সম্মান করতেন। কৌশলে জ্ঞানও নিতেন। স্যারও উজাড় করে শেয়ার করতেন। অনেক কিছু জানা একজন মানুষ। এতো সহজে সব তুলে ধরতেন একেকটি বিষয় সকলের মাঝে মুগ্ধতা ছড়াতো। এখানে তিনি অনন্য। সোনার মানুষ। দেশের প্রকৌশলীদের তাজ ছিলেন। এক কথায়, ‘ Father of the Engineers’

লেখক:
সহকারী রেজিস্ট্রার
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়(চুয়েট)।
মোবাইল-০১৬৭৩৭৬৪৫৬